2018


সম্পাদকীয়

প্রিয় বন্ধুরা,
আমরা এই পৃথিবীতে এসেছি ক্ষণিকের জন্য। সময় ফুরিয়ে গেলেই চলে যেতে হবে এখান থেকে। সময় ফুরোবার আগের এই সময়গুলোকে আমরা বলে থাকি জীবন। জীবনের প্রতিটা মুহূর্তে আমাদের সাথে কিছু না কিছু ঘটে। প্রত্যেক মানুষের সাথে ঘটে। এসব ঘটনার সবটুকুই হতে মানুষের জন্য শিক্ষণীয়। আগত প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয়। 

একসময় বুড়ো দাদা-দাদি বা নানা-নানির কাছে এমনি অতীতগল্প বা ঘটনা শোনার একটি মধুর সংস্কৃতি আমাদের ছিল। তাঁরা নাতি-নাতনীর বয়স চিন্তা করে অত্যন্ত যত্ন সহকারে শোনাতেন মজার মজার এবং শিক্ষণীয় গল্প। কালের আবর্তের সেই সংস্কৃতির উপরে ধূলো পড়ে যাচ্ছে।

গল্পের আরেকটি শক্ত অবস্থান হল সাহিত্য। সাহিত্যে গল্পের এই অবস্থান দুয়েকদিন আগের কথা নয়। যুগ যুগ ধরে সাহিত্যের কোলে করেও গল্প এসেছে আমাদের কাছে। যারাই সাহিত্যচর্চা করেছে, কিছু না কিছু গল্প লিখেছে।

হ্যাঁ বন্ধুরা,
বর্তমানেও আমরা যারা সাহিত্যচর্চা করছি, তাদের জন্য সেই ধারা বজায় রাখতে প্রবচন এবার আয়োজন করেছে 'গল্প সংখ্যা'র। এ সংখ্যায় পাঠকদের জন্য রয়েছে চমৎকার চমৎকার বেশ কিছু গল্প। 
তাই আর কোন দেরি নয়। দেখে আসা যাক ভেতরে কী কী গল্প রয়েছে।



বৃষ্টিভেজা লীলাবতী


বৃষ্টি ঝরছে। অঝরে ঝিরঝিরিয়ে। আকাশ থেকে পাহাড় চূড়ায়। পাতার কোল বেয়ে অবিশ্রান্তভাবে। গড়িয়ে পড়ছে নীরবে। চারপাশের টুপটাপ শব্দ আর শীতল সমীরণ, ছড়িয়ে দিচ্ছে মন্ত্রমুগ্ধতা।
এমনি বৃষ্টিস্নাত আবেশ জড়িয়ে হাঁটছি দু'জন। মালতী আর আমি। সে নিশ্চুপ, আমিও নীরবতা পালন করছি ওর সাথে। তার চুল ওড়ানো আলুথালু বাতাস। মনটা কেমন উদাস হয়ে ওঠে। মুগ্ধ নয়নে হাজারো ভাবনা এসে লুটিয়ে পড়ে। এলোমেলো করে দেয় সবকিছু।
বিজয়ী সম্রাটের মতো উঁচু উঁচু পাহাড়িকা। নিবিড় অরণ্যের ফাঁক গলে সর্পিল সরুপথ। বৃষ্টিজলে নেয়ে-মেখে পিচ্ছিল। কাদায় কর্দমাক্ত দু'জনের জুতো। পিছলে যাবার কাঙ্খিত ভয়। পা টিপে টিপে হাঁটছি আমরা। মনে হচ্ছিলো যেন এভারেস্ট জয় করছি। একসময় আমাদের চলতি পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো প্রচুর কাদা। কী আর করার! অনোন্যপায় হয়ে জুতো হাতেই হাঁটতে শুরু করি। ওঠা-নামার সময় কখন যে সে আমার হাত ধরেছে কিংবা তারটা আমি, বুঝতেই পারিনি।
মাথার ওপরে বিশাল আকাশ। নীলের ভাঁজে ভাঁজে তুলোমেঘ, উড়ে যাচ্ছে কারো সন্ধানে। ধোঁয়াটে মেঘের যবনিকা ঘটতে শুরু করেছে। আমার মনে শত প্রশ্ন এসে সংশয়ের সৃষ্টি করে। ভাবনার অতলে হারিয়ে যাই সংগোপনে,  নিশ্চুপ প্রকৃতির আবগাহনে। সারাদিন কাটিয়ে দিতে পারি এসব এলোমেলো ভাবনায়। দিনমান আকাশে এই যে মেঘের আনাগোনা; মুখে হাত রেখে ভাবতে থাকি- অদ্ভুত সব! কী রহস্যঘেরা!!
ধাই ধাই ছুটে চলছে শুভ্র মেঘ। ছুঁয়ে যাওয় বাতাসে বৃষ্টির ছড়াছড়ি। ইলশেগুঁড়ির মতো বৃষ্টির হইচই। বাতাসের ঝাপটায় আন্দোলিত সতেজ অরণ্য। হিমবাতাসে জুড়িয়ে যাচ্ছিলো মন ও মনন। অরণঘেঁষা লেকের দু'পাশে সাজানো স্টিলের চেয়ার। একপাশে উঁচু ঢিবি। চেয়ারে গিয়ে বসে পড়ি আমরা।
মালতীকে বেশ স্নিগ্ধ দেখাচ্ছিলো। কৃষ্ণাবরণে সাক্ষাত লীলাবতী। বড্ড মায়াবী চেহারা। সেই মায়ায় ডুবে হয়তো কাটিয়ে দেয়া যাবে অনন্তকাল। মালতী আজ দারুণ সেজেছে। বেশ অপ্সরী দেখাচ্ছে তাকে। চোখ জুড়ানো হাসিরেখা টেনে লেকের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছে সে। আমি নির্বাক তাকিয়ে আছি ওর দিকে। কখনো দু'জন দুজনকে দেখি পরম মুগ্ধতায়। এভাবে কতক্ষণ কেটে গেছে বলতে পারি না।
সময়টা তখন দ্বিপ্রহর। ঢিবির ঢালু পথটি বেয়ে সামনে চলতে থাকি। পুকুরের কোলঘেঁষে পথটি চলে গেছে। পুকুর থেকে ভেসে আসছিলো পানকৌড়ির ডাক। বড্ড নস্টালজিক সুরটা। এমন গুরুগম্ভীর ডাক বর্ষার মৌনতাকে ভারিক্কি করে তোলে। একটানা টুব-টুব-টুব শব্দের ডাক। পুকুরের পানিগুলো স্বচ্ছ টলটলে। কয়েকটি শাপলা-শালুক তাকিয়ে আছে নির্মলভাবে আমাদের দিকে। এপার থেকে অপারে নৌকার চলাচলে শাপলাফুলেরা বিপর্যস্ত, বোঝাি যাচ্ছে। নয়তো পুকুরজুড়ে থাকতো শাপলা-শালুকের মনোরম শোভা।
আমরা যেদিকে বসেছিলাম, তার ডানপাশে কৃত্রিম পাহাড়ী ঝর্না। ইলেক্ট্রিক নলকূপ টেনে বানানো হয়েছে। বিকেল হলে অবিশ্রান্ত জলধারা গড়িয়ে পড়ে। এই দুপুরে ঝর্নার চারপাশে পাখিদের উন্মাদনা। মেতে আছে গায়ক পাখির দল। বন-প্রান্তর পাখিদের কলাকাকলিতে মুখরিত।
সময়টা চৈত্র-বৈশাখের সন্ধিক্ষণ। ডালে ডালে কাঁচা সবুজের উচ্ছ্বাস। ঝোপঝাড়ের ফাঁক গলে উঁকি দিচ্ছে বিচিত্র রঙের পুষ্পকলিরা। নতুনভাবে সেজেছে প্রকৃতি। নতুনত্বের ছোঁয়া দুলিয়ে দেয় হৃদয়। বৃষ্টিভেজা বাতাসের সঙ্গী আমরা। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি এসে মাথায় পড়ছিলো। হালকা ঠাণ্ডায় দুয়েকটা কাঁশি সংকেত দেয়। মৃদু ভয়ের রেখা কপোলে  ভাঁজ টানে। আনমনে বলে উঠি- অসুখ করছে না তো! মালতী অনুযোগেরর সুরে বলে- অলক্ষুণে কথা না বললে কী হয়না? তার কথাটি অগ্রাহ্য করার মতো নয়। মাথায় ছাতা দিয়ে ঢেকে নিলাম দু'জনে।
***
দুপুর পেরিয়ে বিকেল। ধীরে ধীরে কালো মেঘের আবরণটা চটজলদি সরে যেতে থাকে। লাজুক সূর্যটাও উঁকি দিতে থাকে। পশ্চিমমুখী পাহাড় আর গ্রামগুলো ধোয়ামোছা রোদে ঝলমল হয়ে ওঠে। সবুজ পাতার গায়ে রোদের ছটায় চমকাতে থাকে। এমন ঝলমলে বিকেল, পাহাড় আর গ্রামগুলো; মনে হয় না কিছুক্ষণ আগে বৃষ্টিজলে নেয়ে-মেখে একাকার ছিলো।
মালতী আরো একান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে বললো- চলো না একটু ওদিকটা ঘুরে দেখি! ওদিকে খোলামাঠে গড়ান হাওয়া। সুদূর দিগন্তে সবুজের মাখামাখি। মাঝে মাঝে উঁচু-নিচু পাহাড়ের ঢেউ। কিছুদূর গিয়ে আবার মিলিয়ে গেছে শূণ্যতায়।
আমরা পিচঢালা পথে চলে আসি। রাস্তার পাশে কৃষ্ণচূড়া আমাদের হাতনেড়ে ডাকে। ফুলগুলো বাসরঘরের মতো সাজিয়ে রেখেছে চারপাশ। মালতীর নাকি খুব পছন্দ কৃষ্ণচূড়া। তার মুখে আজ আনন্দের মিষ্টি হাসি। কতো দিনের মেঘাবৃত জীবন, জীবনের চারদেয়াল! এ দেয়ালে শুভ্র মেঘ আজ ঢাকা পড়েছে।
মাঝে মাঝে মালতীর জীবনে প্রভাতী আলো ফোটে। কিন্তু সময়ের আবর্তনে আলোকরশ্মি হারিয়ে নেমে আসে রাত। ওর জীবনে কিছু সুখানন্দ এলেও কপালে তা সয় না। বহুদূরে- যেখানে দুঃখরা লুকিয়ে থাকে, সুখানন্দ মুখ থুবড়ে পড়ে তার কেন্দ্রে। আমিই তখন মালতীর একমাত্র সুখ হয়ে দেখা দিই। তার পাশে গিয়ে দাঁড়াই। সাহস দিয়ে বীর জয়াদের গল্প শোনাই।
গোধূলী বিকেল। সন্ধার মায়াবী পাখিরা উড়ে যাচ্ছে নীড়ে। সূর্য পালিয়ে যেতে পার করছে ব্যস্ত সময়। ধীরে ধীরে শূণ্যতা নেমে আসছে চারদিকে। নীলাকাশে মেঘেরা আবার জমাট বাঁধছে। সবাই ফিরছে। এবার ফিরতে হবে আমাদেরও...


কুতুবমিনারের সেই দিন
তাওহীদ আদনান

হিন্দুস্তান এসেছি মাস কয়েক হয়ে গেলো৷ এখানে আসার মূল উৎস হলো দারুল উলুম দেওবন্দ৷ মাদারে ইলমীতে ইলমের স্বাদ নেয়ার আগ্রহ সেই বাল্যকাল থেকেই৷ অবশেষে চলেও এলাম আল্লাহর ফজল ও করমে৷ আল্লাহ পাকের শুকরিয়া যে, তিনি কবুল করেছেন আমাকে আমার এই স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানে৷

 আকাঙ্খা ছিলো, হিন্দুস্তান যেহেতু এসেছি, এবার মুসলিম ঐতিহ্যের নিদর্শনগুলোও পর্যবেক্ষণ করবো৷ তবে সময় যেন আর হয়েই উঠছিলো না৷ দিন গড়িয়ে যাচ্ছে৷ পড়া লেখায় ব্যস্ততাও ক্রমশ বাড়ছে৷ মনটা কেমন যেন ভেঙ্গে যেতে লাগলো৷ ঐতিহ্যের কুতুবমিনার, জামে মসজিদ আর লালকেল্লার নাম শুনেছিলাম বহু আগেই৷ এমন স্থান মিস করা যেন মেনেই নিতে পারছিলাম না৷

দিনটি ছিলো ২০১৬ সালের ১০ নভেম্বর। বাংলাদেশ থেকে দেওবন্দ সফরে এলেন দু'জন ব্যক্তিত্বশীল মানুষ৷ এবার যে তাদের নিয়ে যেতেই হবে ছোটখাট কোন ট্যুরে৷ মনে মনে ভালোই লাগছিলো৷ কিন্তু পড়ালেখার কী হবে; ভাবনায় পড়ে গেলাম৷ এরই মধ্যে পেলাম আশার বাণী৷ ১২ ও ১৩ নভেম্বর জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের বার্ষিক সভা হবে রাজস্তানে৷ সে হিসেবে আগে পরে দু'একদিনসহ সভার দিনগুলোতে মাদরাসায় কিছুটা শীথিলতাও থাকতে পারে। ব্যস, প্রোগ্রাম বানিয়ে নিলাম ঝটপট৷

১১ নভেম্বর। সকাল সকাল রওয়ানা হলাম৷ উদ্দেশ্য দিল্লির কুতুবমিনার৷ দেওবন্দ থেকে  ফার্স্ট প্যাসেঞ্জার এক্সপ্রেসে পৌঁছলাম নয়া দিল্লি। সফরসঙ্গী আগত মেহমানদ্বয়সহ মোট পাঁচজন আমরা৷ মেহমানদের আবার ১২ ও ১৩ তারিখের প্রোগ্রামে রাজস্তান যাবার ইচ্ছেও প্রচুর৷ তাই হাতে সময়ও কিছুটা কম৷ ফলে নয়া দিল্লি থেকে  ঘন্টা খানেকের মধ্যেই ছুটলাম কুতুবমিনারের পথে৷ সকলের পরামর্শক্রমে আব্দুল হাই ভাইয়ের চেনা পথে আমরা চেপে বসলাম মেট্রোতে৷ হিন্দুস্তানে মেট্রো-সফর এক মজাদার অনুভূতি। এখানে এসে এ সফর না হলেই নয়৷ দিল্লি শহর থেকে ১৪ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এই কুতুবমিনার৷ যেতে যেতেই কেটে গেলো বেশ কিছুটা সময়৷ কুতুবমিনার যখন পৌঁছলাম সূর্যটা তখন ঠিক মাথার উপর৷

টিকেট কিনে ঝটপট ঢুকে পড়লাম ভেতরে৷ প্রধান গেট দিয়ে ঢুকতেই সামনে খোলা মাঠ৷ হাতের ডানে 'কুওয়াতুল ইসলাম' মসজিদ আর বামে সুন্দর সবুজঘেরা সমতল মাঠ৷ মাঠের বরাবর বামেই ঐতিহাসিক কুতুবমিনার। গাছ-গাছালীর ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলো স্বপ্নের সেই মিনারটি। ভেতরে ঢুকতেই আমাদেরকে স্বাগত জানালো কিছু বাদামী গোলাপ ও নাম না-জানা অন্যান্য ফুল৷ ফুলেল শুভেচ্ছা যেন একেই বলে৷ ফুলের গন্ধে মৌ মৌ করছিলো চারদিক৷ মাতোয়ারা ছিলাম আমরা সবাই৷ বেশ কিছু গাছের পাতায় পাতায় বসে থাকা পাখিগুলো ডেকে উঠছিলো থেমে থেমে৷ মনমাতানো সুরে গেয়ে যাচ্ছিলো অবিরাম৷ হেলে দুলে ধীর পায়ে এগিয়ে চললাম সামনের দিকে৷

 প্রবেশ করলাম মূল সৌধের অভ্যন্তরে৷ চোখের সামনে ভেসে উঠলো আশপাশের বেশ কিছু প্রাচীন এবং মধ্যযুগীয় স্থাপনা ও ধ্বংসাবশেষ৷  যেগুলো একত্রে কুতুব কমপ্লেক্স হিসেবেই পরিচিত। এই কমপ্লেক্সটি ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে তালিকাবদ্ধ৷ দিল্লির জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রের অন্যতম এই কুতুব মিনার৷ সৌধের ভেতরেই আছে বাদশা ইলতুতমিশের কবর৷ কুতুব মিনার ২০১৬ সালের সর্বোচ্চ পরিদর্শিত সৌধ, যা তাজমহলের চেয়েও বেশি৷ ২০১৬ তে  যেখানে তাজমহলে পর্যটকের সংখ্যা ছিলো ২৫.৪ লাখ, সেখানে কুতুবমিনারে পর্যটক সংখ্যা ছিলো ৩৮.৯৫ লাখ৷

একটু ডানে এলাম৷ দেখলাম কুতুবমিনারের অপর পাশেই রয়েছে আরো একটি অসমাপ্ত ইটের মিনার৷ যার ব্যাপারে তেমন কোনো তথ্যই পেলাম না কারো কাছে৷ তবে এ'টুকু জানা গেলো যে, এর নির্মাণ কাজ শুরু করার পর বিশেষ কোন কারণে তা আর সমাপ্ত করা সম্ভব হয়নি৷

কুতুবমিনারের আরেক পাশে দেখা গেলো একটি লোহার পিলার৷ এটা নাকি প্রাচীন ভারতীয় লৌহকারদের অসাধারণ দক্ষতার একটি নিদর্শন৷ ধারণা করা হয় ১৬০০ বছর আগে তৈরি করা হয়েছিলো এই লৌহ স্তম্ভটি। এর উচ্চতা মোট ২৩ ফুট আট ইঞ্চি, যার তিন ফুট আট ইঞ্চিই রয়েছে মাটির নিচে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এতো বছর পরেও  এতে  জং ধরেনি একটুও৷ বিশেষজ্ঞরা এর বিশ্লেষণ করে অনেক তথ্য তুলে ধরেছেন। এতো বছর আগেও উন্নতমানের লোহার পাশাপাশি তাদের বিজ্ঞানসম্মত নির্মাণ কৌশলের কারণে নাকি স্তম্ভটি আজও বহাল তবিয়তে আছে। ব্রাহ্মণ লিপিতে খোদাই করা স্তম্ভে সংস্কৃত ভাষাতেও একটি প্রাচীনতম লিপি দেখা যায়৷  প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে এই প্রাচীনতম লেখাটি গুপ্ত রাজাদের রাজত্বকালের। লিপিতে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী জানা যায়, স্তম্ভটি উৎসর্গ করা হয়েছে ভগবান বিষ্ণুকে।

১১৯২ খ্রিস্টাব্দে চৌহান রাজা তাঁর সমকালীন এক রাজাকে তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে পরাজিত করেন। চৌহান রাজার এ বিজয়ের কিছুদিন পর ১১৯৩ সালে মুহাম্মাদ ঘুরির সেনাপতি ও প্রতিনিধি কুতুবুদ্দিন আইবেক ভারতবর্ষে অাধিপত্য অর্জন করতে সক্ষম হন৷ তিনিই ছিলেন ভারতের প্রথম মুসলিম শাসক৷ সে সময় তিনি দিল্লিতে 'কুওয়াতুল ইসলাম' নামে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন৷ আর তার পাশেই নির্মাণ আরম্ভ করেন একটি সুউচ্চ মিনারের, যা বর্তমান বিশ্বের সর্বোচ্চ মিনার হিসেবে বিবেচিত৷ 
১১৯৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি কুতুবমিনারের গোড়াপত্তন করলেও তাঁর তত্ত্বাবধানে কেবল প্রথম ও দ্বিতীয় তলাই নির্মিত হয়। এরপর ১২১১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুতমিশের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে মিনারের তৃতীয় ও চতুর্থ তলা এবং শেষে সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের হাতে পঞ্চম তলার নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয়। পরবর্তীকালে কুতুবুদ্দীন আইবেকের নামানুসারেই এর নামকরণ করা হয় 'কুতুবমিনার'৷

মূলত কুতুবমিনার একটি বিজয়স্তম্ভ৷ এটি মুসলমানদের ভারত বিজয়ের এক অনন্য স্মারক৷ স্মরণিকা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাতশো বছর ধরে৷ এ মিনারটি ভারতবর্ষের মুসলিম ঐতিহ্যের এক ঐতিহাসিক নিদর্শন। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে নির্মিত এই কুতুবমিনারই ভারতবর্ষের সর্বোচ্চ টাওয়ার। এর উচ্চতা ৭২.৫ মিটার। মিনারের অভ্যন্তরে উপরে উঠার সিঁড়ি রয়েছে ৩৭৯ টি। মিনারের ব্যাস নিচের দিকে ১৪.৩ মিটার এবং উপরের দিকে ২.৭৫ মিটার। কুতুবমিনারের দক্ষিণ-পশ্চিমে রয়েছে ২৫ ইঞ্চির একটি ঢাল, যা 'নিরাপদ সীমা' বলে বিবেচিত৷

কুতুবমিনার মিনারটি তৈরী করা হয়েছে পরিপূর্ণ লাল বেলে পাথর দিয়ে৷  এসব পাথরের উপরে খোদাই করে লেখা হয়েছে পবিত্র কুরআনের আয়াত। বেলে পাথরের উপরে আয়াতসমৃদ্ধ এসব আকর্ষণীয় ক্যালিওগ্রাফি মিনারের সৌন্দর্য বাড়িয়ে কয়েকগুণ। এছাড়াও মিনারের প্রাচীরকে দেখা যাচ্ছিলো নানা প্রকারের অলঙ্করণ দ্বারা সুশোভিত। 

ঐতিহাসিকদের অভিমত হচ্ছে, 'কুওয়াতুল ইসলাম মসজিদ' এর মুসুল্লিদের সুবিধার্থে আযান দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হতো কুতুবমিনার। প্রথম তলায় আযান দেয়া হতো নিয়মিত। সর্বাধিক উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণে  নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ টাওয়ার হিসেবেও এর ব্যবহারের উপযোগিতাও লক্ষণীয়।

ভূমিকম্পের কারণে কুতুবমিনার বেশ ক'বার বিধ্বস্ত হলেও মুসলিম শাসকগণ পুনঃনির্মাণ ও সংস্কারের উদ্যোগ নিতে বিলম্ব করেননি বিন্দুমাত্রও। ১৫০৫ সালে উপরের দু'টি তলা ভূমিকম্পের কারণে বিধ্বস্ত হলে সুলতান ইলতুতমিশ পুনঃনির্মাণের উদ্যোগ নেন। ১৭৯৪ সালে ভূমিকম্পের ফলে এর কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্থ হলে সুলতান সিকান্দর লোদী আবার সংস্কারের ব্যবস্থা করেন।

১০০ একর জমির উপর কুতুব কমপ্লেক্সে  কুওয়াতুল ইসলাম মসজিদ, কুতুব মিনার ও লৌহ পিলার ছাড়াও রয়েছে আলাই মিনার ও আলাই গেট৷ রয়েছে সুলতান ইলতুতমিশ, সুলতান গিয়াস উদ্দীন বলবন, সুলতান আলাউদ্দিন খালজী ও ইমাম জামিনের সমাধি৷ 

সময়ের স্বল্পতা ছিলো শুরু থেকেই। তাই যথেচ্ছা ঘোরাঘুরির ফুরসত আর হয়ে উঠলো না৷ তবুও এই স্বল্প সময়ে কুতুবমিনারকে দেখেছিলাম মন ভরে৷ তার দৃশ্য ছিলো মোহনীয়৷ দেখছিলাম চাতক পাখির ন্যায়। লোভাতুর দৃষ্টি মেলে কেবল তাকিয়ে ছিলাম তার রূপ-সৌন্দর্যের পানে৷

বেলা গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা৷ ফিরতে হবে এখনি৷ যাত্রা বহুদূর৷ বেরিয়ে এলাম কুতুব কমপ্লেক্স থেকে৷ পথ ধরলাম সোজা নয় দিল্লির৷ দেখতে দেখতে আকাশে ছেঁয়ে গেছে লালিমায়। সূূর্যটা কুসুম বর্ণ ধারণ করে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলো পশ্চিমাকাশে৷ দেখতে দেখতে কখন যে হারিয়ে গেলো সূর্যটা, টেরই পেলাম না। এরই মধ্যে পৃথিবীকে ঢেকে নিলো আঁধার৷

 দেওবন্দ, ভারত।


কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের গর্ব
মুহাম্মাদ এমদাদুল্লাহ

বাংলা সাহিত্য জগতে যার কাব্য নানা রঙে রঙিন, নানা বর্ণে বর্ণিল। যার শব্দ, কথামালা এবং ভাষাশিল্পে রয়েছে নান্দনিকতা, নিপুণ কৌশল। যার কবিতা ও গানে মানুষ জেগে ওঠে নতুন করে। ফিরে পায় স্বপ্নযাত্রার মসৃণ পথ। তিনি আমাদের প্রিয় কবি, জাগৃতির কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

পুষ্প প্রস্ফুটিত হয়েছিল সেই কতদিন আগে! কিন্তু তার সুবাসে আজও সুবাসিত উদ্যান; সাহিত্য উদ্যান। তাঁর পাঁপড়ি ছুঁয়ে তরুণ হৃদয়ে সঞ্চারিত হয় নবচেতনা। তাঁর কাব্যে বেজে ওঠে দেশপ্রেম, স্বাধীনতা ও জাতীয়তাবোধ। তাঁর ছন্দমালায় উদ্ভাসিত হয় সভ্যতা ও সংস্কৃতি। মানুষ খুঁজে পায় আত্মার প্রশান্তি।

যেখানে মিথ্যা ভেঁড়াজাল, সেখানে তাঁর কবিতার ঝংকারে নেচে উঠেছিল সত্যের স্থবির মূর্তি। আলোর ঝাণ্ডা ওড়াতে গিয়েই শিকলবদ্ধ হতে হয়েছিল বৃটিশদের কাছে। এ শৃঙ্খল বড় নিষ্ঠুর জেনেও লড়ে গিয়েছেন আমাদের জাতীয় কবি। এমন প্রতিভাবান সাহসী কবি বাংলার উদ্যানে আর আসবে কিনা সন্দেহ। দীর্ঘস্বরে যুলুম- অত্যাচারের বিরুদ্ধে 'অগ্নিবীণা' আর কে রচনা করবে? আর কে আমাদের শোনাবে 'বল বীর, বল উন্নত মম শির'? নজরুলের সুরে 'বিষের বাঁশি' বাজানোর সাধ্য আছে কারও? 'সর্বহারা' 'সন্ধ্যা'য় 'সাম্যবাদী' একজন কবি ছিলেন আমাদের গর্বের ধন কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

আজ সেই প্রিয় কবির জন্মদিনে তাঁকে খুবই মনে পড়ছে। দেখতে ইচ্ছে করছে এক পলক। কিন্তু তা সম্ভব নয় জানি। তবে কবিতার শব্দে শব্দে আজীবন তাঁকে দেখি হৃদয়ের মাঝখানে। তিনি অমর, তাঁর কর্ম ও প্রতিভা অমর। সারাজীবন তিনি বেঁচে থাকবেন বাংলার মাটিছোঁয়া মানুষের অন্তরে, সাহিত্য ও কবিতার ঝংকারে।

[ আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম ছোট্ট একটি নদীঘেঁষা গ্রাম চুরুলিয়াতে। অখণ্ড ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমায় এই গ্রাম। কে জানত শতাব্দীর এক মহান কবি এপথ হয়ে আসছেন, যিনি অন্ধকার পৃথিবীতে সম্ভাবনার আশার আলো ছড়াববেন? দিনটি ছিল ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ই জ্যৈষ্ঠ অনুযায়ী ১৮৯৯ ইংরেজী সালের ২৫ মে তারিখ । মা জাহেদা খাতুন ও বাবা কাজী ফকির আহমদের ভালোবাসার প্রতীক নজরুল পীরপুকুর সংলগ্ন বিখ্যাত কাজী পরিবারে জন্মলাভ করেন। তাঁর শৈশবের দিনগুলোও এখানেই অতিবাহিত হয়। তখন কবির ডাকনাম ছিলো দুখু মিয়া।

শৈশবের কবি নজরুল ছিলেন প্রচণ্ড ডানপিঠে ও চঞ্চল প্রকৃতির। একসময় দারিদ্রের তাড়নায় রুটির দোকানে খেটে খেতে হয়েছিল তাঁকে। জীবনমুখী সংগ্রাম। পড়ালেখা ছিল দশম শ্রেণী পর্যন্ত। মেধার জোরে ক্লাসে প্রথম হতেন সবসময়। ধর্ম-কর্মেও নজরুল কম ছিলেন না। তৎকালীন মক্তবে প্রাথমিক ইসলামি শিক্ষার পাঠ প্রদানও করেছেন তিনি। পরবর্তিতে ইসলামি জাগরণের অসংখ লিখনী ও কবিতায় তিনি বাংলা সাহিত্যাঙ্গণকে সমৃদ্ধ করেন। বাংলার পাশাপাশি আরবী ও ফার্সী ভাষাতেও তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল।

নজরুল আমাদের জাতীয় কবি, তিনি ভালবাসার প্রতিচ্ছবি হয়েই আজীবন বেঁচে থাকবেন আমাদের অন্তরে, হৃদয়ের গভীরে]



বিস্ফোরণ
কাজী হামদুল্লাহ

খুলবে না রে বদ্ধ দুয়ার জাগবি না রে তোরা,
বিশ্ববাসী বুঝে গেছে তোদের দু'পা খোঁড়া।
কাঁদবে না রে হৃদয় কারো দেখে সকল কিছু,
চকচকে নীল গাধা দেখে ছুটিস তোরা পিছু।
দাম হারাবে মান হারাবে থাকিস সদা ভীত,
কিল হাঁকালেও আজ সেটাকে ভেবে রাখিস হিত।
কিল দিয়েছে গাল বরাবর দু'দিন পরেই চাঁটা
মারবে, তবু তাদের পিছু ছাড়বি না কী হাঁটা?
লোকসমাগম দেখলে ওরা সালাম তোদের ঠোঁকে,
প্রেম দেখিয়ে গেম খেলে যায় হাওয়ায় বুলি ফোঁকে।
লোকমাগম নেই যেখানে কিংবা শুধুই তোরা,
তোদের মাঝে দেয় এঁকে দ্বেষ-সহিংসতার ফোঁড়া।
বাংলাদেশে মানুষ মরে আরব-আরাকানে
ওরাই যে এর নাটের গুরু সবাই কী তা জানে? 
যুবক-বুড়ো-শিশুর প্রতি চোখ ফেলেনি জানি,
চোখ মেলে তাই খোঁজে কোথায় চলবে হানাহানী।
জঙ্গি ধরে মারতে যারা শোনায় হাজার গাথা,
রোজ নীশিতে ওদের গায়েই জঙ্গিবাদের কাঁথা

 Follow on Facebook  
সাহিত্য সাময়িকী প্রবচন এর ৫ম সংখ্যায় প্রকাশিত গল্প
পুলিশের চোখে পানি

সকাল সাতটা। শীতের প্রকোপে ঘর থেকে বের হওয়ার কোন উপায় নেই তারপরও বের হতে হলো। বাবা আমি আর বাবার সহকর্মী বাদল কাকা। টয়োটা কোম্পানির ওল্ড মডেলের সাদা গাড়িটাতে চেপে বসলাম। গায়ে মোটা মোটা জ্যাকেট তবুও শীত করছে। 
আমরা যাচ্ছি কুতুপালংয়ে, চিটাগাংয়ের একটা শহর মনে হয়। মা তো কিছুতেই আমাকে যেতে দেবে না। এ নিয়ে বাবার সাথে ঠাণ্ডা গলায় মার ঝগড়াও হয়েছে। ঝগড়ার কারণটা বলি, মা বললো, বারো বছরের একটা ছেলে কুতুপালং যেয়ে কি করবে? তাও আবার প্রচণ্ড শীতে! বাবা বললো, সারাদিন ও তো বাসাতেই থাকে। বাইরের জগতটা কী ও দেখবে না! বাইরের মানুষ সম্পর্কে না জানলে ও বেড়ে উঠবে কিভাবে? বাবার যুক্তির কাছে মাকে হার মানতেই হলো, যার কারণে এখন আমি কুতুপালংয়ে যেতে পারছি। যেখানে রোহিঙ্গারা থাকে। 
গাড়ির পেছনে দুইটা খাদ্যের বস্তা ওঠানো হয়েছে। গন্তব্যে পৌঁছতে অনেকের সমস্যা হলেও আমাদের কোন সমস্যা হলো না। কারণ আমাদের গাড়ির সামনে পুলিশ লেখা একটা প্ল্যাকার্ড লাগানো ছিলো। 
ও ভালো কথা, আমার বাবার পরিচয় তো দেয়া হয়নি। আমার বাবা পুলিশের একজন বড় কর্মকর্তা। বাবার সহকর্মী বাদল কাকার ভাষায় আমার বাবা খুবই সৎ একজন পুলিশ, যা তিনি কসম খেয়ে বলতে পারবেন। কসম খাওয়ার কোন দরকার নেই। বাবা সত্যিই অনেক সৎ মানুষ । কোনদিন থানা পর্যায়ে চাকরি করেননি। থানায় কাজ করা মানে অনেক অনেক টাকার হাতছানি তবুও বাবা যাননি। যেহেতু রাত তাই আমরা একটা হোটেলে (সস্তা মানের) উঠেছিলাম। পরেরদিন সকাল হতেই বাবার সাথে রোহিঙ্গা শিবিরে প্রবেশ করলাম।
প্রচণ্ড শীত। তার উপরে আবার বৃষ্টি। হলুদ কাদামাটিতে হাঁটা মুশকিল তবুও হাঁটতে হলো। বাবার মতো দীর্ঘদেহী আর শক্তিশালী মানুষটার কারণে আমার স্লিপ কিংবা আছাড় খাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। বাদল কাকা ছিলেন ঠিক আমাদের পিছনে। হঠাৎ তিনি হাউমাউ করে আছাড় খেয়ে পড়ে গেলেন। যেহেতু পাহাড়ের উঁচুনিচু জায়গা তাই আছাড় খাওটাই স্বাভাবিক। বাদল কাকা স্বাভাবিক অবস্থাতেই অবশ্য সব কষ্ট সামলে নিলেন। আমাকে বললেন- ভাতিজা, আছাড় খাওয়া আমার রিজিকে ছিলো, তাই আছাড় খাইছি। আছাড়েও একটা মজা আছে।
হা হা হা! বাদল কাকার রসিকতায় আমি হাসলাম কিন্তু বাবা সম্পূর্ণ নির্বিকার। কিছুটা দূরে কয়েকজন রোহিঙ্গা শিশু বাঁশের উপর বসেছিল। কেউ ল্যাংটা, কেউ হাফপ্যান্ট পরা আবার কেউ শুধু একটা গেঞ্জি পরা। বাবা বাদল কাকাকে ডেকে বললেন- বাদল, ঐ পিচ্চিগুলোকে দেখো, মন দিয়ে দেখো। 
-জ্বী স্যার দেখছি। 
আচ্ছা বাদল, তুমি কি তোমার কৈশোর মনে করতে পারো?
অবশ্যই মনে করতে পারি স্যার। এই পিচ্চি বয়সে ওদের মতোই খালি গায়ে থাকতাম। মাঝে মাঝে হাফপ্যান্টও পরতাম।
কিন্তু ওদের মতো তুমি কি এরকম বিষণ্ন থাকতে?
বাদল কাকা বাবার প্রশ্ন করার হেতুটা এবার বুঝলেন। বাদল, তোমাকে বলেছিলাম মন দিয়ে দেখতে, এবার হয়তো দেখতে পাচ্ছো, তাই না ?
জ্বী স্যার, বাদল কাকাও হঠাৎ বিষণ্ন হয়ে গেলেন। স্যার, আমাদের সবার শৈশবই কিন্তু ভীষণ আনন্দে কেটেছে। গাছের রস চুরি করে খাওয়া কিংবা কারো গাছে ঢিল মেরে আম পেড়ে আনা, আরো কতো কী! 
আমাদের চারপাশে আস্তে ধীরে অনেকগুলো রোহিঙ্গা শিশু জমা হয়ে গেলো। সবাই ধরতে গেলে ল্যাংটা। 
মহিলারাও জড়ো হচ্ছে। বাবা বাদল কাকাকে বললেন, বাদল, বস্তা খুলে 'বিসমিল্লাহ' বলে খাবার দেয়া শুরু করো।
খাদ্য বিতরণ প্রায় শেষ পর্যায়ে। হঠাৎ কোত্থেকে এক মহিলা এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্নাকাটি শুরু করে দিল; 'সাদেক, ও সাদেক! তোর পেটে গুলি লাগে নাই? তুই বাঁচলি কেমনে বাজান? তোর আব্বারে তো ওরা মাইরা ফেলাইছে।'
মহিলা আমাকে জড়িয়ে ধরে বিলাপ করে করে কাঁদছে। বাবা কোন প্রতিবাদ করলেন না, হয়তো আমার বয়সী কিম্বা আমার মতো এই মহিলার কোন ছেলে আছে যাকে মিয়ানমারের মগসেনারা গুলি করে মেরে ফেলেছে। 
মহিলার দুইজন আত্মীয় এসে মহিলাকে নিয়ে গেলো। আমি যেমনটা ধারণা করেছিলাম, ঘটনা ঠিক তেমনটাই। সাদেক নামে আমার মতো তার এক ছেলেকে গতকাল মগসেনারা গুলি করে হত্যা করেছে। এরপর থেকেই মহিলা পাগলের মতো হয়ে গেছে। বাবা মহিলার হাতে বড় বড় দুই প্যাকেট টোস্ট তুলে দিতেই মহিলা বলল, আমার সাদেক খাইছে? ও না খাইলে আমি খাই কেমনে? মহিলা কাঁদতে কাঁদতে বেহুশ হয়ে গেলো। 
খাদ্য বিতরণ শেষ। ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছি। সারা পথ বাবা কোন কথা বললেন না। নিরব, নির্বিকার গুলি খাওয়া একজন নিথর মানুষের মতো বাবা বসেছিলেন। কখন যেন অসতর্কতায় তার চোখের কোণ দিয়ে ঝরে পড়লো একফোঁটা জল, একফোঁটা অশ্রু।
প্রবচন
সাহিত্য সাময়িকী
নিয়মিত পড়ুন, লিখুন ও বিজ্ঞাপন দিন।


      ঘষামাজা       
আইয়ুব বিন মঈন


(সূচনা পর্ব)
বাংলাভাষা অন্য যে কোনো ভাষার চেয়ে বহুলাংশে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বিশেষ করে বর্ণ, অক্ষর ও শব্দের দিক থেকে। জোড়াতালি দিয়ে কোনো বর্ণ বা শব্দ তৈরি করতে হয় না। প্রতিটি উচ্চারণের জন্য ভিন্ন ভিন্ন অক্ষর বা বর্ণ আছে। সম্বোধনের ক্ষেত্রে সম্বোধিত ব্যক্তির স্তর ও মর্যাদা অনুসারে রয়েছে স্বতন্ত্র শব্দমালা। যেমন ইংরেজিতে সবার জন্য শুধু You ব্যবহার হয়, অথচ বাংলায় ব্যবহার হয় তুই, তুমি ও আপনি। 
আপনি সম্মানসূচক শব্দ। ক্রিয়াপদের ক্ষেত্রে তার শেষে ‘ন’ যোগ করে সেই সম্মান দেখাতে হয়। তবে সবার জন্যই এমন সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহার করা চলে না। এ জন্য তার বয়স আঠার বছর পেরুতে হয়। এছাড়া কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার বেলায়ও তা প্রযোজ্য নয়। তবে ব্যতিক্রম হিসেবে কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহার করা আবশ্যক আর সেটি হল “মহামান্য আদালত’’। আর হ্যাঁ, এই “মহামান্য” শব্দটাও কিন্তু শুধু দু’টি জায়গা ছাড়া অন্য কোথাও ব্যবহার করা যাবে না। সেই দুই জায়গার একটি হল ব্যক্তি অন্যটি হল প্রতিষ্ঠান তথা রাষ্ট্রপতি ও আদালত। এক্ষেত্রে বলতে হবে মহামান্য রাষ্ট্রপতি/প্রেসিডেন্ট ও মহামান্য আদালত। এছাড়া অন্য কোথাও, এমনকি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জন্যও “মহামান্য” শব্দটি ব্যবহার করা যাবে না।


জিজ্ঞেস
কোন ব্যক্তিকে ‘আপনি’ বলাটা সঠিক হবার জন্য আঠার বছর পার হতে হবে?
জবাব
এটা সাধারণ নিয়ম। আঠার পেরুলে তিনি অন্যের কাছ থেকে সম্মান পাওয়ার অধিকার ভোগ করেন। এছাড়া এটা অনেকটা নির্ভর করে উভয়ের সম্পর্কের ওপর। (সংক্ষিপ্ত জবাব)

জিজ্ঞেস
কেউ যদি “মহামান্য পোপ” বলে সম্মোধন করে, তাহলে সঠিক হবে? অনেকের ফেসবুক ‘পোষ্টে’ এমনটা দেখা যায়।
জবাব
কেউ “মহামান্য চৌকিদার” বললেও তো তার মাথায় কুড়াল মারা যাবে না। নিয়ম এক জিনিস আর তা মেনে চলা আরেক জিনিস। 
এই যে আপনি “পোস্ট”কে বানিয়ে দিয়েছেন “পোষ্ট”, এটা কে কীভাবে ঠেকাবে? তবে নিয়ম জানতে চাইলে বলা যাবে মাত্র...  
    (চলমান)

সাহিত্য সাময়িকী প্রবচন
পড়ুন, লিখুন ও বিজ্ঞাপন দিন

সাহিত্য সাময়িকী প্রবচন ৫ম সংখ্যায় প্রকাশিত


ধৈর্যের পাহাড়
সাহাবি হযরত আবু তালহা রাযিয়াল্লাহু আনহু। তাঁর স্ত্রী একজন গুণবতী নারী। তিনি সব সময় আল্লাহর ইচ্ছার ওপর সন্তুষ্ট থাকেন। তাঁদের একটি শিশু ছেলে আছে। ছেলেটিকে তাঁরা অনেক ভালোবাসেন। একদিন ছেলেটি অসুস্থ হয়ে পড়ল। কিছুদিন অসুস্থ থাকার পর ছেলেটি একদিন মারা গেল।
প্রিয় ছেলের মৃত্যুতে মায়ের মন হাহাকার করে উঠল। তবুও তিনি আল্লাহর ইচ্ছার ওপর ধৈর্য ধরলেন। ছেলের লাশ কাপড় দিয়ে ঢেকে একপাশে রেখে দিলেন। প্রতিদিনের মতো সংসারের সব কাজ সারলেন। হযরত আবু তালহা রাযিয়াল্লাহু আনহু কোনো কাজে বাইরে গিয়েছিলেন। ছেলের মৃত্যুর খবর পাননি। তাঁর স্ত্রী প্রতিবেশীদের বলে রাখলেন, ছেলের বাবা বাড়িতে এলে কেউ যেন তাঁকে ছেলের মৃত্যুর খবর না দেয়, সময় মত আমিই বলব।
সন্ধ্যার সময় হযরত আবু তালহা রাযিয়াল্লাহু আনহু বাড়িতে ফিরলেন। তখনও তাঁর খাওয়া-দাওয়া হয়নি। তিনি প্রথমে ছেলের অবস্থা জিজ্ঞেস করলেন। বুদ্ধিমতি স্ত্রী জবাব দিলেন, ছেলে আগের চেয়ে অনেক শান্তিতে আছে।
হযরত আবু তালহা রাযিয়াল্লাহু আনহু নিশ্চিন্ত মনে খেয়ে শুয়ে পড়লেন। স্ত্রী সকালবেলা স্বামীকে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা বলুন দেখি, কেউ যদি আপনাকে কোনো জিনিস ধার দেয় এবং সময় শেষ হওয়ার পর তার জিনিস ফেরত চায়, তাহলে আপনি কি তা ফেরত দেবেন না?
হযরত আবু তালহা জবাব দিলেন, তা কেমন করে হতে পারে? তার জিনিস সে ফেরত নেবে, আমি তা আটকে রাখব কেন?
স্ত্রী বললেন, তাহলে আপনার কাছে আল্লাহ যে শিশু ছেলেটি আমানত রেখেছিলেন তার সময় শেষ হওয়ার পর তিনি তা ফেরত নিয়েছেন। তার জন্য সবর করুন।
হযরত আবু তালহা রাযিয়াল্লাহু আনহুও  স্ত্রীর মত সবর করলেন। ধৈর্যের পাহাড় হলেন। ছেলের কাফন দাফন শেষ হওয়ার পর তারা স্বামী-স্ত্রী মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে গিয়ে সব ঘটনা বললেন। নবীজি তাঁদের সবর দেখে অনেক খুশি হলেন। তাঁদের জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন। আল্লাহ তাঁদের সবরের পুরস্কার হিসেবে আরেকটি ছেলে সন্তান দান করলেন। আগের সব কষ্ট ভুলিয়ে দিলেন।

শিক্ষা: পৃথিবীতে সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, মা-বাবার সামনে সন্তানের মৃত্যু। এমন কষ্টের সময়ও সাহাবায়ে কেরাম ধৈর্য ধরেছেন। আমরাও বিভিন্ন দুঃখ-কষ্টের সময় ধৈর্য ধরব। এর বিনিময়ে আল্লাহ তা’লা আমাদেরকে অনাবিল সুখ-শান্তি দান করবেন।


সাদাসিধে জীবন
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু। তিনি দ্বিতীয় খলিফা উমর ফারুক রাযিয়াল্লাহু আনহুর ছেলে। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একদিন আমি নিজের ঘরে খাবার খাচ্ছি। এর মধ্যে আমিরুল মুমিনীন হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এলেন। আমি তাঁর জন্য দস্তরখানে জায়গা করে দিলাম। তিনি সেখানে বসে পড়লেন। এরপর ‘বিসমিল্লাহ’ বলে এক লোকমা খাবার নিলেন। দ্বিতীয় লোকমা নিয়ে বললেন, আমার মনে হচ্ছে, এই তরকারিতে এমন চর্বি আছে, যা গোশতের নয়। তা আলাদাভাবে দেয়া হয়েছে।
আমি বললাম- আমিরুল মুমিনীন, আমি আজ দুই দিরহাম নিয়ে বাজারে গিয়েছিলাম। আমার ইচ্ছা ছিল, ভালো মানের চর্বিওয়ালা গোশত কিনব। কিন্তু তা অনেক দাম ছিল। তাই এক দিরহাম দিয়ে সাধারণ গোশত, আর এক দিরহাম দিয়ে ঘি কিনে গোশতের মধ্যে ঢেলে দেই। 
একথা শুনে হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গোশত ও ঘি উভয়টা একসঙ্গে এলে, তিনি একটি খেতেন অপরটি দান করে দিতেন। উভয়টি একসঙ্গে খেতেন না। তাই আমিও এই তরকারি খাব না। এতে গোশত ও ঘি দু'টোই আছে। 
আমি বললাম- আমিরুল মুমিনীন, এখন আপনি এটা খেয়ে নিন। আগামীতে যখনই গোশত ও ঘি একসঙ্গে মিলবে, তখন তাই করব। একটি নিজের জন্য রাখব এবং অপরটি দান করে দেব।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন- না, আমি তা খাবই না।

শিক্ষা: আমিরুল মুমিনীন হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দুনিয়ার মোহ স্পর্শ করতে পারেনি। পারেনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ থেকে চুল পরিমাণ দূরে সরাতে। ফলে তাঁরা হয়েছেন বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। তাই আমাদেরও উচিত তাঁদের আদর্শ গ্রহণ করা। তাঁদের মত ও পথ অনুসরণ করা।

দরিয়ার নামে চিঠি
হযরত উমর ফারুক রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনকালে মিশর জয় হলো। মিশরের অধিবাসীরা আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে গেল। তখন তিনি মিশরের গভর্নর। ‘বু-নাহ’ মাস শুরু হয়ে গেছে। তখনকার আঞ্চলিক মাসসমূহের একটি মাসের নাম বু-নাহ। মিশরীয়রা আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে আরজ করল- আমিরুল মুমিনীন, আমাদের নীল দরিয়ার ব্যাপারে একটি প্রথা রয়েছে, এটা ছাড়া এই মৌসুমে এতে পানি প্রবাহিত হয় না।
আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেন, কী সেই প্রথা?
মিশরীয়রা বলল, বু-নাহ মাসের বারো তারিখ চলে গেলে, কোনো মা-বাবার কাছ থেকে তাদের একমাত্র অবিবাহিত মেয়েকে আমরা নিয়ে আসি। তাকে উত্তম পোশাক এবং অলংকার পরিয়ে সাজিয়ে তুলি। এরপর মেয়েটিকে নীল দরিয়ায় ফেলে দেই। তখন এতে পানি প্রবাহিত হয়। 
একথা শুনে আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু আশ্চর্য হয়ে বললেন, এই ধরনের কাজ ইসলামে নিষেধ। ইসলাম তো জাহেলি যুগের সব কুপ্রথা মুছে দিয়েছে।
মিশরীয়রা আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর কথায় দরিয়ায় মেয়ে ফেলা বন্ধ রাখল।
কিন্তু নীল দরিয়া প্রবাহিত হচ্ছে না। তাই তারা কষ্টে পড়ে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু বিস্তারিত অবস্থা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে লিখে পাঠালেন। প্রতি উত্তরে হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু লিখলেন, এই ব্যাপারে আপনি যেই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন তা ঠিক আছে। আপনি আপনার সিদ্ধান্তের ওপর অটল থাকুন। আমি এই চিঠির ভেতরে একটি চিরকুট পাঠালাম। আপনি এটা নীল দরিয়ায় ফেলবেন।
হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কথামতো আমর ইবনুল আস চিরকুটটি নীল দরিয়ায় ফেললেন। হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু চিরকুটে লিখেছেন, ‘হে নীল দরিয়া, তুমি যদি আল্লাহর হুকুমে চল, তাহলে প্রবাহিত হও।’ হঠাৎ পরদিন ভোরে আল্লাহ তা’লার কুদরতে নীল দরিয়ায় প্রচুর পানি বয়ে যেতে লাগল। এক রাতের মধ্যে ষোলহাত পানি এসে ভরে গেল। নীল দরিয়ার পানি এখনো বয়ে চলেছে। মিশরবাসীর জন্য এটা আল্লাহ তা’লার বড় নেয়ামত।

শিক্ষা: আল্লাহ তা’লার প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস থাকলে, আল্লাহ সেই আস্থা ও বিশ্বাসের পুরস্কার দেন। কথায় আছে না, ‘ভক্তিতে মুক্তি, বিশ্বাসে দরিয়া পার’।


সাহসের প্রতিবাদ
খোলাফায়ে রাশেদিনের শাসনকাল শেষ হয়ে সবেমাত্র বনু উমাইয়ার শাসনকাল শুরু হয়েছে। খোলাফায়ে রাশেদিনের শাসনকাল মানে প্রধান চার খলিফার শাসনকাল। প্রধান চার খলিফা হলেন, হযরত আবু বকর সিদ্দিক, হযরত উমর ফারুক, হযরত উসমান গণি এবং হযরত আলী মুরতাজা [রাযিয়াল্লাহু আনহুম]।
তখন মারওয়ান মদিনার গভর্নর। মদিনায় যারা বনু উমাইয়াদের শাসনের বিরুদ্ধে ছিল, তাদের ওপর সমানে জুলুম চালাচ্ছে। সরকারের হুকুমের বিরুদ্ধে কাউকে টু শব্দটিও করতে দিচ্ছে না। মদিনার লোকেরা মারওয়ানের ওপর বিরক্ত হয়ে উঠল। তাকে কেউ পছন্দ করে না। মারওয়ান মসজিদে নামাজ পড়ায়। লোকেরা তার পেছনে নামাজ পড়ে। কিন্তু নামাজের পর সে কিছু বলতে চাইলে লোকেরা উঠে উঠে চলে যায়। জুমআর নামাজের খুতবা হয় নামাজের আগে। খুতবা মানে বক্তৃতা। লোকেরা বাধ্য হয়ে তার খুতবা বা বক্তৃতা শোনে। কিন্তু ঈদের নামাজের পর কেউ খুতবা শোনে না। নামাজের পর নীরবে লোকেরা চলে যেতে থাকে। 
মারওয়ান দেখল, ঈদের নামাজে তার খুতবার সময় লোকেরা চলে যায়। তাই সে এক ফন্দি বের করল। সে নামাজের আগে খুতবা পড়ে ফেলার ইচ্ছা করল। তাহলে আর কেউ চলে যেতে পারবে না। মারওয়ান নামাজের আগে খুতবা পড়তে দাঁড়াল। সে মনে করল, তার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস কারো নেই। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই হযরত আবু সাঈদ রাযিয়াল্লাহু আনহু দাঁড়িয়ে গেলেন। তিনি সাহসী কণ্ঠে প্রতিবাদ জানালেন। বললেন- ‘মারওয়ান, তুমি যত বড় গভর্নরই হওনা কেন, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিয়মে কোনো পরিবর্তন করার অধিকার তোমার নেই। নবীজি ঈদের জামাতে নামাজের পর খুতবা দিয়েছেন। তুমি নামাজের আগে খুতবা দিতে পারো না।’
মারওয়ান আগে খুতবা দিতে অনেক চেষ্টা করল। কিন্তু উপস্থিত জনতার রাগ-ক্ষোভ দেখে তার ইচ্ছা বদলাতে হলো। এরপর মারওয়ান আর কোনো দিন মহানবী সাল্লাল্লাহু    আলাইহি    ওয়াসাল্লামের   কোনো   নিয়ম পরিবর্তনের কথা ভাবতে পারেনি। তার সব ক্ষমতা এখানে এসে দুর্বল হয়ে পড়ে।

শিক্ষা : মাত্র একজন সাহাবির প্রতিবাদে সেদিন ইসলাম বিরাট ক্ষতি থেকে বেঁচে গেল। হযরত আবু সাঈদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সেদিন প্রতিবাদ না জানালে হয়তো আজ ইসলামের মধ্যে অনেক পরিবর্তন ও কাটছাঁট দেখা দিত। আমরাও ইসলাম ও দেশের বিরুদ্ধে অন্যায় দেখলে সাহস ও প্রজ্ঞার সাথে প্রতিবাদ জানাব।

সম্পাদক, বাংলাদেশ ইসলামী লেখক ফোরাম।


সাহিত্য সাময়িকী প্রবচন
নিয়মিত পড়ুন, লিখুন ও বিজ্ঞাপন দিন

ব্যস্ত স্বাধীনতা
কাজী হামদুল্লাহ

এই ব্যস্ত নগরেও মানুষ অলস পড়ে আছে,
ড্রাইভারের অলস গতি টপকে যায় পথিক,
রোড পারাপারে উদ্যমী মানুষের দলছুট দশা
উপেক্ষা করে যায় ট্রাফিক পুলিশ ও ড্রাইভার।
উড়ালসেতুর পাতালে ব্যস্ত কিছু প্রাণীর দীর্ঘঃশ্বাস,
তবে ব্যস্ততা অবৈধ দখলের, অবৈধ আবাসনের(!)

শপিং কমপ্লেক্সের সিঁড়িঘেঁষা ব্যস্ত দু'জন নারী আর
ছেঁড়া জামা পরিহিত একটি ফুটফুটে শিশু,
হন্তদন্ত ছোটা দারোয়ান, ব্যস্ত তার চলার গতি।
ব্যস্ত শহরে এ'টুকু ব্যস্ততা যে না হলেই নয়!

দৈনিক পত্রিকার অফিসে টিমটিমে আলো
একপাশের আবছা আঁধারে  লাঠি হাতে বসা
একজন বয়োবৃদ্ধ ভিক্ষুক কিংবা একজন মানুষ।
গ্রাম থেকে এসেছে সেই পাঁচ-ছ'মাসের বেশি,
বড় ছেলে দুবাই ফেরত তাই উত্তাপ সারা দেহে;
চোখের জলে পিতা শীতল করছে তা অথবা দগ্ধ।
অলস সময় কাটে তার হেডনিউজকারী ভবনটায়,
একপাশের ময়লা দেয়ালঘেঁষা পাঁজর ছুঁয়ে।

একজন ব্যস্ত সংবাদকর্মী বা সাংবাদিকের হাসি,
ফুরফুরে মেজাজ, লাফিয়ে মাড়ায় সিঁড়িগুলো।
অতপর হেডলাইনের নিচে একপাশে নিজের নাম;
তৃপ্তি-পরিতৃপ্তিতে উচ্ছ্বসিত হয় তার ব্যস্ত চেহারা।

থলে হাতে ব্যস্ত ক্রেতার ছুটোছুটি দোকান-দোকান,
কতোক্ষণ চালের জন্যই ঘুরোঘুরি আর দৌড়ঝাঁপ;
অন্যকিছুর জায়গা হয়তো থলেতে নেই কিংবা পকেটে...
ঘন্টা তিনেক পর অলস পায়ে বাড়ি ফেরে ক্রেতা,
রান্নার কাজে ব্যস্ত হতে তার গিন্নী যে উদগ্রীব!

এই ব্যস্ত নগরের আলসেমী আমাদের স্বাধীনতা?
এই  অলসপ্রহরে ব্যস্ততা আমাদের উন্নতি?
অলস লোকগুলো আর ব্যস্ত মানুষ
যেদিন একাকার হবে,
সেদিন বুঝবো আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি,
আমরা মানুষ হয়েছি, মানুষের বন্ধু হয়েছি।

১৯ মার্চ ২০১৮, রাত ১০.১৯ মিনিট
আগ্রাবাদ থেকে হাটহাজারীর পথে

















এ পি জে আবদুল কালামের জীবন থেকে...


[কান্না চেপে রাখুন এবং পড়ুন। নিজেকে সমৃদ্ধ করুন, আমার জন্য দয়া করে দোয়া করুন-  মুহিউদ্দিন আকবর।]


যখন আমি ছোট ছিলাম, আমার মা আমাদের জন্য রান্না করতেন। তিনি সারাদিন প্রচুর পরিশ্রম করার পর রাতের খাবার তৈরি করতেন। এক রাতে তিনি বাবাকে এক প্লেট সবজি আর একেবারে পুড়ে যাওয়া রুটি খেতে দিলেন।
আমি অপেক্ষা করছিলাম বাবার প্রতিক্রিয়া কেমন হয় সেটা দেখার জন্য। কিন্তু বাবা চুপচাপ রুটিটা খেয়ে নিলেন এবং আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন স্কুলে আমার আজকের দিনটা কেমন গেছে।
আমার মনে নেই বাবাকে সেদিন আমি কি উত্তর দিয়ে ছিলাম কিন্তু এটা মনে আছে যে, মা পোড়া রুটি খেতে দেয়ার জন্য বাবার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন। এর উত্তরে বাবা মা’কে যা বলেছিলেন সেটা আমি কোনদিন ভুলব না। বাবা বললেন, ‘প্রিয়তমা, পোড়া রুটিই আমার পছন্দ।’
পরবর্তীতে সেদিন রাতে আমি যখন বাবাকে শুভরাত্রি বলে চুমু খেতে গিয়েছিলাম তখন আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম যে তিনি কি আসলেই পোড়া রুটিটা পছন্দ করেছিলেন কিনা।
বাবা আমাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘তোমার মা আজ সারাদিন অনেক পরিশ্রম করেছেন এবং তিনি অনেক ক্লান্ত ছিলেন। তাছাড়া একটা পোড়া রুটি খেয়ে মানুষ কষ্ট পায় না বরং মানুষ কষ্ট পায় কর্কশ ও নিষ্ঠুর কথায়। জেনে রেখো, জীবন হচ্ছে ত্রুটিপূর্ণ জিনিস এবং ত্রুটিপূর্ণ মানুষের সমষ্টি।
আমি কোনক্ষেত্রেই সেরা না বরং খুব কম ক্ষেত্রেই ভাল বলা যায়। আর সবার মতোই আমিও জন্মদিন এবং বিভিন্ন বার্ষিকীর তারিখ ভুলে যাই। এ জীবনে আমি যা শিখেছি সেটা হচ্ছে, আমাদের একে অপরের ভুলগুলোকে মেনে নিতে হবে এবং সম্পর্কগুলোকে উপভোগ করতে হবে।
জীবন খুবই ছোট; প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে অনুতপ্ত বোধ করার কোন মানেই হয় না। যে মানুষগুলো তোমাকে যথার্থ মূল্যায়ন করে তাদের ভালোবাসো আর যারা তোমাকে মূল্যায়ন করে না তাদের প্রতিও সহানুভূতিশীল হও।
তখন ১৯৪১ সাল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। আমরা থাকতাম রামেশ্বরম শহরে। এখানে আমাদের পরিবার বেশ কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে সময় পার করছিল।
আমার বয়স তখন মাত্র ১০ বছর। কলম্বোতে যুদ্ধের দামামা বাজছে, আমাদের রামেশ্বরমেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। খাবার থেকে শুরু করে নিত্যব্যবহার্য পণ্য, সবকিছুরই দারুণ সংকট।
আমাদের সংসারে পাঁচ ভাই, পাঁচ বোন। তাদের মধ্যে তিনজনের আবার নিজেদেরও পরিবার আছে, সব মিলিয়ে এক এলাহি কাণ্ড। আমার দাদি ও মা মিলে সুখে-দুঃখে এই বিশাল সংসার সামলে রাখতেন।
আমি প্রতিদিন ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠে অঙ্ক শিক্ষকের কাছে যেতাম। বছরে মাত্র পাঁচজন ছাত্রকে তিনি বিনা পারিশ্রমিকে পড়াতেন। আমার মা আশিয়াম্মা ঘুম থেকে উঠতেন আমারও আগে। তিনি আমাকে গোসল করিয়ে, তৈরি করে তারপর পড়তে পাঠাতেন।
পড়া শেষে সাড়ে পাঁচটার দিকে বাড়ি ফিরতাম। তারপর তিন কিলোমিটার দূরের রেলস্টেশনে যেতাম খবরের কাগজ আনতে। যুদ্ধের সময় বলে স্টেশনে ট্রেন থামত না, চলন্ত ট্রেন থেকে খবরের কাগজের বান্ডিল ছুড়ে ফেলা হত প্ল্যাটফর্মে।
আমার কাজ ছিল সেই ছুড়ে দেওয়া কাগজের বান্ডিল সারা শহরে ফেরি করা, সবার আগে গ্রাহকের হাতে কাগজ পৌঁছে দেওয়া।
কাগজ বিক্রি শেষে সকাল আটটায় ঘরে ফিরলে মা নাশতা খেতে দিতেন। অন্যদের চেয়ে একটু বেশিই দিতেন, কারণ আমি একই সঙ্গে পড়া আর কাজ করতাম।
সন্ধ্যাবেলা স্কুল শেষ করে আবার শহরে যেতাম লোকজনের কাছ থেকে বকেয়া আদায় করতে। সেই বয়সে আমার দিন কাটত শহরময় হেঁটে, দৌড়ে আর পড়াশোনা করে।
একদিন সব ভাইবোন মিলে খাওয়ার সময় মা আমাকে রুটি তুলে দিচ্ছিলেন, আমিও একটা একটা করে খেয়ে যাচ্ছিলাম (যদিও ভাত আমাদের প্রধান খাবার, কিন্তু রেশনে পাওয়া যেত গমের আটা)।
খাওয়া শেষে বড় ভাই আমাকে আলাদা করে ডেকে বললেন, ‘কালাম, কী হচ্ছে এসব? তুমি খেয়েই চলছিলে, মাও তোমাকে তুলে দিচ্ছিল। তার নিজের জন্য রাখা সব কটি রুটিও তোমাকে তুলে দিয়েছে। এখন অভাবের সময়, একটু দায়িত্বশীল হতে শেখো। মাকে উপোস করিয়ে রেখো না।’
শুনে আমার শিরদাঁড়া পর্যন্ত শিউরে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে মায়ের কাছে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরলাম।
মাত্র পঞ্চম শ্রেণিতে পড়লেও পরিবারে ছোট ছেলে হিসেবে আমার একটা বিশেষ স্থান ছিল। আমাদের বাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল না। কেরোসিন দিয়ে বাতি জ্বালানো হতো; তাও শুধু সন্ধ্যা সাতটা থেকে নয়টা পর্যন্ত।
মা আমাকে কেরোসিনের ছোট্ট একটা বাতি দিয়েছিলেন, যাতে আমি অন্তত রাত ১১টা পর্যন্ত পড়তে পারি। আমার চোখে এখনো পূর্ণিমার আলোয় মায়ের মুখ ভাসে।আমার মা ৯৩ বছর বেঁচে ছিলেন।
ভালোবাসা আর দয়ার এক স্বর্গীয় প্রতিমূর্তি ছিলেন আমার মা। মা, এখনো সেদিনের কথা মনে পড়ে,যখন আমার বয়স মোটে ১০। সব ভাইবোনের ঈর্ষাভরা চোখের সামনে তোমার কোলে মাথা রেখে ঘুমাতাম।
সেই রাত ছিল পূর্ণিমার। আমার পৃথিবী শুধু তোমাকে জানত মা! আমার মা! এখনো মাঝরাতে ঘুম ভেঙে উঠি। চোখের জল গড়িয়ে পড়ে। তুমি জানতে ছেলের কষ্ট মা। তোমার আদরমাখা হাত আমার সব কষ্ট ভুলিয়ে দিত।
তোমার ভালোবাসা, তোমার স্নেহ, তোমার বিশ্বাস আমাকে শক্তি দিয়েছিল মা। সৃষ্টিকর্তার শক্তিতে ভয়কে জয় করতে শিখিয়েছিল।
[সূত্র: এ পি জে আবদুল কালামের নিজস্ব ওয়েবসাইট। ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ: অঞ্জলি সরকার]
প্রবচন মিডিয়ার পরিবেশনায় সাহিত্য সাময়িকী প্রবচন

Contact Form

Name

Email *

Message *

Powered by Blogger.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget