বৃষ্টিভেজা লীলাবতী


বৃষ্টি ঝরছে। অঝরে ঝিরঝিরিয়ে। আকাশ থেকে পাহাড় চূড়ায়। পাতার কোল বেয়ে অবিশ্রান্তভাবে। গড়িয়ে পড়ছে নীরবে। চারপাশের টুপটাপ শব্দ আর শীতল সমীরণ, ছড়িয়ে দিচ্ছে মন্ত্রমুগ্ধতা।
এমনি বৃষ্টিস্নাত আবেশ জড়িয়ে হাঁটছি দু'জন। মালতী আর আমি। সে নিশ্চুপ, আমিও নীরবতা পালন করছি ওর সাথে। তার চুল ওড়ানো আলুথালু বাতাস। মনটা কেমন উদাস হয়ে ওঠে। মুগ্ধ নয়নে হাজারো ভাবনা এসে লুটিয়ে পড়ে। এলোমেলো করে দেয় সবকিছু।
বিজয়ী সম্রাটের মতো উঁচু উঁচু পাহাড়িকা। নিবিড় অরণ্যের ফাঁক গলে সর্পিল সরুপথ। বৃষ্টিজলে নেয়ে-মেখে পিচ্ছিল। কাদায় কর্দমাক্ত দু'জনের জুতো। পিছলে যাবার কাঙ্খিত ভয়। পা টিপে টিপে হাঁটছি আমরা। মনে হচ্ছিলো যেন এভারেস্ট জয় করছি। একসময় আমাদের চলতি পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো প্রচুর কাদা। কী আর করার! অনোন্যপায় হয়ে জুতো হাতেই হাঁটতে শুরু করি। ওঠা-নামার সময় কখন যে সে আমার হাত ধরেছে কিংবা তারটা আমি, বুঝতেই পারিনি।
মাথার ওপরে বিশাল আকাশ। নীলের ভাঁজে ভাঁজে তুলোমেঘ, উড়ে যাচ্ছে কারো সন্ধানে। ধোঁয়াটে মেঘের যবনিকা ঘটতে শুরু করেছে। আমার মনে শত প্রশ্ন এসে সংশয়ের সৃষ্টি করে। ভাবনার অতলে হারিয়ে যাই সংগোপনে,  নিশ্চুপ প্রকৃতির আবগাহনে। সারাদিন কাটিয়ে দিতে পারি এসব এলোমেলো ভাবনায়। দিনমান আকাশে এই যে মেঘের আনাগোনা; মুখে হাত রেখে ভাবতে থাকি- অদ্ভুত সব! কী রহস্যঘেরা!!
ধাই ধাই ছুটে চলছে শুভ্র মেঘ। ছুঁয়ে যাওয় বাতাসে বৃষ্টির ছড়াছড়ি। ইলশেগুঁড়ির মতো বৃষ্টির হইচই। বাতাসের ঝাপটায় আন্দোলিত সতেজ অরণ্য। হিমবাতাসে জুড়িয়ে যাচ্ছিলো মন ও মনন। অরণঘেঁষা লেকের দু'পাশে সাজানো স্টিলের চেয়ার। একপাশে উঁচু ঢিবি। চেয়ারে গিয়ে বসে পড়ি আমরা।
মালতীকে বেশ স্নিগ্ধ দেখাচ্ছিলো। কৃষ্ণাবরণে সাক্ষাত লীলাবতী। বড্ড মায়াবী চেহারা। সেই মায়ায় ডুবে হয়তো কাটিয়ে দেয়া যাবে অনন্তকাল। মালতী আজ দারুণ সেজেছে। বেশ অপ্সরী দেখাচ্ছে তাকে। চোখ জুড়ানো হাসিরেখা টেনে লেকের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছে সে। আমি নির্বাক তাকিয়ে আছি ওর দিকে। কখনো দু'জন দুজনকে দেখি পরম মুগ্ধতায়। এভাবে কতক্ষণ কেটে গেছে বলতে পারি না।
সময়টা তখন দ্বিপ্রহর। ঢিবির ঢালু পথটি বেয়ে সামনে চলতে থাকি। পুকুরের কোলঘেঁষে পথটি চলে গেছে। পুকুর থেকে ভেসে আসছিলো পানকৌড়ির ডাক। বড্ড নস্টালজিক সুরটা। এমন গুরুগম্ভীর ডাক বর্ষার মৌনতাকে ভারিক্কি করে তোলে। একটানা টুব-টুব-টুব শব্দের ডাক। পুকুরের পানিগুলো স্বচ্ছ টলটলে। কয়েকটি শাপলা-শালুক তাকিয়ে আছে নির্মলভাবে আমাদের দিকে। এপার থেকে অপারে নৌকার চলাচলে শাপলাফুলেরা বিপর্যস্ত, বোঝাি যাচ্ছে। নয়তো পুকুরজুড়ে থাকতো শাপলা-শালুকের মনোরম শোভা।
আমরা যেদিকে বসেছিলাম, তার ডানপাশে কৃত্রিম পাহাড়ী ঝর্না। ইলেক্ট্রিক নলকূপ টেনে বানানো হয়েছে। বিকেল হলে অবিশ্রান্ত জলধারা গড়িয়ে পড়ে। এই দুপুরে ঝর্নার চারপাশে পাখিদের উন্মাদনা। মেতে আছে গায়ক পাখির দল। বন-প্রান্তর পাখিদের কলাকাকলিতে মুখরিত।
সময়টা চৈত্র-বৈশাখের সন্ধিক্ষণ। ডালে ডালে কাঁচা সবুজের উচ্ছ্বাস। ঝোপঝাড়ের ফাঁক গলে উঁকি দিচ্ছে বিচিত্র রঙের পুষ্পকলিরা। নতুনভাবে সেজেছে প্রকৃতি। নতুনত্বের ছোঁয়া দুলিয়ে দেয় হৃদয়। বৃষ্টিভেজা বাতাসের সঙ্গী আমরা। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি এসে মাথায় পড়ছিলো। হালকা ঠাণ্ডায় দুয়েকটা কাঁশি সংকেত দেয়। মৃদু ভয়ের রেখা কপোলে  ভাঁজ টানে। আনমনে বলে উঠি- অসুখ করছে না তো! মালতী অনুযোগেরর সুরে বলে- অলক্ষুণে কথা না বললে কী হয়না? তার কথাটি অগ্রাহ্য করার মতো নয়। মাথায় ছাতা দিয়ে ঢেকে নিলাম দু'জনে।
***
দুপুর পেরিয়ে বিকেল। ধীরে ধীরে কালো মেঘের আবরণটা চটজলদি সরে যেতে থাকে। লাজুক সূর্যটাও উঁকি দিতে থাকে। পশ্চিমমুখী পাহাড় আর গ্রামগুলো ধোয়ামোছা রোদে ঝলমল হয়ে ওঠে। সবুজ পাতার গায়ে রোদের ছটায় চমকাতে থাকে। এমন ঝলমলে বিকেল, পাহাড় আর গ্রামগুলো; মনে হয় না কিছুক্ষণ আগে বৃষ্টিজলে নেয়ে-মেখে একাকার ছিলো।
মালতী আরো একান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে বললো- চলো না একটু ওদিকটা ঘুরে দেখি! ওদিকে খোলামাঠে গড়ান হাওয়া। সুদূর দিগন্তে সবুজের মাখামাখি। মাঝে মাঝে উঁচু-নিচু পাহাড়ের ঢেউ। কিছুদূর গিয়ে আবার মিলিয়ে গেছে শূণ্যতায়।
আমরা পিচঢালা পথে চলে আসি। রাস্তার পাশে কৃষ্ণচূড়া আমাদের হাতনেড়ে ডাকে। ফুলগুলো বাসরঘরের মতো সাজিয়ে রেখেছে চারপাশ। মালতীর নাকি খুব পছন্দ কৃষ্ণচূড়া। তার মুখে আজ আনন্দের মিষ্টি হাসি। কতো দিনের মেঘাবৃত জীবন, জীবনের চারদেয়াল! এ দেয়ালে শুভ্র মেঘ আজ ঢাকা পড়েছে।
মাঝে মাঝে মালতীর জীবনে প্রভাতী আলো ফোটে। কিন্তু সময়ের আবর্তনে আলোকরশ্মি হারিয়ে নেমে আসে রাত। ওর জীবনে কিছু সুখানন্দ এলেও কপালে তা সয় না। বহুদূরে- যেখানে দুঃখরা লুকিয়ে থাকে, সুখানন্দ মুখ থুবড়ে পড়ে তার কেন্দ্রে। আমিই তখন মালতীর একমাত্র সুখ হয়ে দেখা দিই। তার পাশে গিয়ে দাঁড়াই। সাহস দিয়ে বীর জয়াদের গল্প শোনাই।
গোধূলী বিকেল। সন্ধার মায়াবী পাখিরা উড়ে যাচ্ছে নীড়ে। সূর্য পালিয়ে যেতে পার করছে ব্যস্ত সময়। ধীরে ধীরে শূণ্যতা নেমে আসছে চারদিকে। নীলাকাশে মেঘেরা আবার জমাট বাঁধছে। সবাই ফিরছে। এবার ফিরতে হবে আমাদেরও...