Follow on Facebook  
সাহিত্য সাময়িকী প্রবচন এর ৫ম সংখ্যায় প্রকাশিত গল্প
পুলিশের চোখে পানি

সকাল সাতটা। শীতের প্রকোপে ঘর থেকে বের হওয়ার কোন উপায় নেই তারপরও বের হতে হলো। বাবা আমি আর বাবার সহকর্মী বাদল কাকা। টয়োটা কোম্পানির ওল্ড মডেলের সাদা গাড়িটাতে চেপে বসলাম। গায়ে মোটা মোটা জ্যাকেট তবুও শীত করছে। 
আমরা যাচ্ছি কুতুপালংয়ে, চিটাগাংয়ের একটা শহর মনে হয়। মা তো কিছুতেই আমাকে যেতে দেবে না। এ নিয়ে বাবার সাথে ঠাণ্ডা গলায় মার ঝগড়াও হয়েছে। ঝগড়ার কারণটা বলি, মা বললো, বারো বছরের একটা ছেলে কুতুপালং যেয়ে কি করবে? তাও আবার প্রচণ্ড শীতে! বাবা বললো, সারাদিন ও তো বাসাতেই থাকে। বাইরের জগতটা কী ও দেখবে না! বাইরের মানুষ সম্পর্কে না জানলে ও বেড়ে উঠবে কিভাবে? বাবার যুক্তির কাছে মাকে হার মানতেই হলো, যার কারণে এখন আমি কুতুপালংয়ে যেতে পারছি। যেখানে রোহিঙ্গারা থাকে। 
গাড়ির পেছনে দুইটা খাদ্যের বস্তা ওঠানো হয়েছে। গন্তব্যে পৌঁছতে অনেকের সমস্যা হলেও আমাদের কোন সমস্যা হলো না। কারণ আমাদের গাড়ির সামনে পুলিশ লেখা একটা প্ল্যাকার্ড লাগানো ছিলো। 
ও ভালো কথা, আমার বাবার পরিচয় তো দেয়া হয়নি। আমার বাবা পুলিশের একজন বড় কর্মকর্তা। বাবার সহকর্মী বাদল কাকার ভাষায় আমার বাবা খুবই সৎ একজন পুলিশ, যা তিনি কসম খেয়ে বলতে পারবেন। কসম খাওয়ার কোন দরকার নেই। বাবা সত্যিই অনেক সৎ মানুষ । কোনদিন থানা পর্যায়ে চাকরি করেননি। থানায় কাজ করা মানে অনেক অনেক টাকার হাতছানি তবুও বাবা যাননি। যেহেতু রাত তাই আমরা একটা হোটেলে (সস্তা মানের) উঠেছিলাম। পরেরদিন সকাল হতেই বাবার সাথে রোহিঙ্গা শিবিরে প্রবেশ করলাম।
প্রচণ্ড শীত। তার উপরে আবার বৃষ্টি। হলুদ কাদামাটিতে হাঁটা মুশকিল তবুও হাঁটতে হলো। বাবার মতো দীর্ঘদেহী আর শক্তিশালী মানুষটার কারণে আমার স্লিপ কিংবা আছাড় খাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। বাদল কাকা ছিলেন ঠিক আমাদের পিছনে। হঠাৎ তিনি হাউমাউ করে আছাড় খেয়ে পড়ে গেলেন। যেহেতু পাহাড়ের উঁচুনিচু জায়গা তাই আছাড় খাওটাই স্বাভাবিক। বাদল কাকা স্বাভাবিক অবস্থাতেই অবশ্য সব কষ্ট সামলে নিলেন। আমাকে বললেন- ভাতিজা, আছাড় খাওয়া আমার রিজিকে ছিলো, তাই আছাড় খাইছি। আছাড়েও একটা মজা আছে।
হা হা হা! বাদল কাকার রসিকতায় আমি হাসলাম কিন্তু বাবা সম্পূর্ণ নির্বিকার। কিছুটা দূরে কয়েকজন রোহিঙ্গা শিশু বাঁশের উপর বসেছিল। কেউ ল্যাংটা, কেউ হাফপ্যান্ট পরা আবার কেউ শুধু একটা গেঞ্জি পরা। বাবা বাদল কাকাকে ডেকে বললেন- বাদল, ঐ পিচ্চিগুলোকে দেখো, মন দিয়ে দেখো। 
-জ্বী স্যার দেখছি। 
আচ্ছা বাদল, তুমি কি তোমার কৈশোর মনে করতে পারো?
অবশ্যই মনে করতে পারি স্যার। এই পিচ্চি বয়সে ওদের মতোই খালি গায়ে থাকতাম। মাঝে মাঝে হাফপ্যান্টও পরতাম।
কিন্তু ওদের মতো তুমি কি এরকম বিষণ্ন থাকতে?
বাদল কাকা বাবার প্রশ্ন করার হেতুটা এবার বুঝলেন। বাদল, তোমাকে বলেছিলাম মন দিয়ে দেখতে, এবার হয়তো দেখতে পাচ্ছো, তাই না ?
জ্বী স্যার, বাদল কাকাও হঠাৎ বিষণ্ন হয়ে গেলেন। স্যার, আমাদের সবার শৈশবই কিন্তু ভীষণ আনন্দে কেটেছে। গাছের রস চুরি করে খাওয়া কিংবা কারো গাছে ঢিল মেরে আম পেড়ে আনা, আরো কতো কী! 
আমাদের চারপাশে আস্তে ধীরে অনেকগুলো রোহিঙ্গা শিশু জমা হয়ে গেলো। সবাই ধরতে গেলে ল্যাংটা। 
মহিলারাও জড়ো হচ্ছে। বাবা বাদল কাকাকে বললেন, বাদল, বস্তা খুলে 'বিসমিল্লাহ' বলে খাবার দেয়া শুরু করো।
খাদ্য বিতরণ প্রায় শেষ পর্যায়ে। হঠাৎ কোত্থেকে এক মহিলা এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্নাকাটি শুরু করে দিল; 'সাদেক, ও সাদেক! তোর পেটে গুলি লাগে নাই? তুই বাঁচলি কেমনে বাজান? তোর আব্বারে তো ওরা মাইরা ফেলাইছে।'
মহিলা আমাকে জড়িয়ে ধরে বিলাপ করে করে কাঁদছে। বাবা কোন প্রতিবাদ করলেন না, হয়তো আমার বয়সী কিম্বা আমার মতো এই মহিলার কোন ছেলে আছে যাকে মিয়ানমারের মগসেনারা গুলি করে মেরে ফেলেছে। 
মহিলার দুইজন আত্মীয় এসে মহিলাকে নিয়ে গেলো। আমি যেমনটা ধারণা করেছিলাম, ঘটনা ঠিক তেমনটাই। সাদেক নামে আমার মতো তার এক ছেলেকে গতকাল মগসেনারা গুলি করে হত্যা করেছে। এরপর থেকেই মহিলা পাগলের মতো হয়ে গেছে। বাবা মহিলার হাতে বড় বড় দুই প্যাকেট টোস্ট তুলে দিতেই মহিলা বলল, আমার সাদেক খাইছে? ও না খাইলে আমি খাই কেমনে? মহিলা কাঁদতে কাঁদতে বেহুশ হয়ে গেলো। 
খাদ্য বিতরণ শেষ। ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছি। সারা পথ বাবা কোন কথা বললেন না। নিরব, নির্বিকার গুলি খাওয়া একজন নিথর মানুষের মতো বাবা বসেছিলেন। কখন যেন অসতর্কতায় তার চোখের কোণ দিয়ে ঝরে পড়লো একফোঁটা জল, একফোঁটা অশ্রু।
প্রবচন
সাহিত্য সাময়িকী
নিয়মিত পড়ুন, লিখুন ও বিজ্ঞাপন দিন।