৫ মে ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ



মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী ও তারেকুল ইসলাম: আজ ঐতিহাসিক ৫ মে। ২০১৩ সালের এই দিনে চট্টগ্রামের দারুল উলুম হাটহাজারী মাদরাসার মুহতামিম ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় আলেম শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বে ‘হেফাজতে ইসলাম’ নামক একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ইসলামবিদ্বেষী ও নবী সা:-এর অবমাননাকারী ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে গণ-আন্দোলন গড়ে তোলে। তারা দাবি আদায়ের জন্য শান্তিপূর্ণ ‘ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি’ পালন করে শাপলা চত্বরে জমায়েত হন। কিন্তু সরকার হেফাজতের মূল দাবি আমলে না নিয়ে সেদিন মধ্যরাতে ওই এলাকার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে অন্ধকারে কাপুরুষের মতো নিরস্ত্র লাখ মানুষের ওপর বর্বরোচিত অভিযান পরিচালনা করে। এই ক্র্যাকডাউনে অনেক নিরীহ আলেম-হাফেজ-মুফতি-মুহাদ্দিস-কারি ও ধর্মপ্রাণ মুসলমান শাহাদতবরণ করেন বলেই জনগণের বিশ্বাস।

যৌথবাহিনীর গুলিতে আহতের সংখ্যা ১০ হাজারেরও বেশি। এখনো আহত অনেকে বুকে ও শরীরে বুলেট বহন এবং অন্ধত্ব ও পঙ্গুত্ব বরণ করে যন্ত্রণাকাতর জীপন যাপন করছেন। সরকার কর্তৃক বহু লাশ গুম করার অভিযোগ উঠেছিল। পরে হামলা-মামলা ও পেশিশক্তির জোরে হেফাজতের নিরীহ নেতাকর্মীদের হয়রানি ও জেল-জুলুমের মাধ্যমে এবং নানা কৌশল ও হুমকি-ধমকি দিয়ে কোণঠাসা করার চেষ্টা করা হয়। এমনকি সরকারের নানামুখী চাপে শাপলা চত্বরে নিহতদের সঠিক সংখ্যা এবং তাদের সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ তথ্যাদি সংগ্রহের ক্ষেত্রেও হেফাজতকে চরমভাবে বাধা দেয়া হয়। নিবর্তনমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রের চরম দমনপীড়ন সত্ত্বেও হেফাজতে ইসলাম শানে রেসালাত সম্মেলন, ওয়াজ-মাহফিল, তাফসির মাহফিল ও সিরাতুন্নবী সা: সম্মেলনের মাধ্যমে দেশব্যাপী শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে। এসব কর্মসূচিতে বিপুল জনসমাগম লক্ষণীয় ।

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশে মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতা হরণ এবং ইসলামপন্থীদের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় উদাহরণ, শাপলা চত্বরে নিহতদের সংখ্যা প্রকাশ করার ‘অপরাধে’ অধিকার-এর সেক্রেটারি আদিলুর রহমান শুভ্রকে গ্রেফতার করা হয়। শাপলা চত্বরের গণহত্যার ব্যাপারে সরকার মূলত দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অন্ধকারে রাখতে চায়; কিন্তু ইনশাআল্লাহ সত্য এক দিন স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হবেই।

হেফাজতের মূল দাবির সত্যতা প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও মহান আল্লাহ পাক ও তাঁর রাসূল সা:-এর অবমাননাকারী, ইসলামবিদ্বেষী ব্লগারদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি সরকার আদৌ মেনে নেয়নি। গণ-আন্দোলনের মুখে কয়েকজন চিহ্নিত ব্লগারকে গ্রেফতারের নাটক সাজালেও তাদের শাস্তি না দিয়ে পরে সুযোগমতো জামিনে ছেড়ে দেয়া হয়। এর পরিণতিতে ‘সুবহানাল্লাহ’ নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, ধর্মদ্রোহী লতিফ সিদ্দিকী, ইসলামের সুদ তথা রিবা নিয়ে অপব্যাখ্যাদানকারী ও কওমি মাদরাসাবিরোধী অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুুহিত, পর্দাবিদ্বেষী সমাজকল্যাণমন্ত্রী মহসিন আলীরা খোদ রাষ্ট্রের কোটর থেকেই একে একে স্বরূপে বেরিয়ে এসেছেন। যদি সরকার হেফাজতের দাবি আমলে নিয়ে ইসলামবিদ্বেষী ব্লগারদের বিচার করত, তাহলে কোনো মন্ত্রী বা নেতা ইসলামি মূল্যবোধ ও তৌহিদি জনতার ঈমান-আকিদায় আঘাত করে কথা বলার সাহস পেতেন না।

হেফাজতে ইসলাম মুসলমানদের ঈমান-আকিদা রক্ষার লড়াইয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকে। ঈমান-আকিদার সঠিক চর্চা, সংরক্ষণ ও লালন করা না হলে মানবজীবন অভিশপ্ত ও নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। ঈমান-আকিদাই হচ্ছে মুসলিম জীবনের সামগ্রিক ব্যবস্থার মূলভিত্তি। শুধু কালেমায়ে শাহাদাত পড়ে মুসলিম নাম ও বেশ ধারণ করলেই ঈমান-আকিদার শর্তগুলো পূরণ হয় না। আল্লাহর একক অস্তিত্বের প্রতি নিরঙ্কুশ বিশ্বাস ও তাকওয়া এবং একইসাথে মানব জাতির জন্য আল্লাহ প্রেরিত নির্দেশনামূলক সামগ্রিক জীবনব্যবস্থা তথা কুরআন ও রাসূল পাক সা:-এর সুন্নাহ অনুসরণ করে জীবন যাপন করাই হলো ঈমান-আকিদা মোতাবেক চলা। এখান থেকে বিচ্যুত হলেই ইহজীবনে বিপর্যয় নেমে আসতে বাধ্য; কেননা ঈমান-আকিদার প্রতি উদাসীনতা এবং এর অনুপস্থিতি সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে বেইনসাফি ও জুলুম কায়েম হওয়ার পথ সুগম করে দেয়। ঈমান-আকিদা সার্বিক ন্যায় ও ইনসাফের কথা বলে। শুধু ভোগের মধ্যেই নয়, ত্যাগেও যে সুখ আছে সেটার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। ঈমান-আকিদা হচ্ছে মহান প্রভুর কাছে দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতার ব্যাপারে উন্মুখ থাকা। ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারিতা ও উন্নাসিকতা দমন করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে এটা। আধ্যাত্মিক সঞ্জীবনী ও অন্তরের আত্মশুদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে শত আইন-কানুনেও মানুষের সহজাত রিপুর তাড়না ও পঞ্চ ইন্দ্রিয় সংযত করা অসম্ভব। মুসলমানদের আধ্যাত্মিক চেতনা তথা তাকওয়ার ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টির মূল নিয়ামক হলো ঈমান-আকিদা। ইসলাম গ্রহণের বা মুসলমান হওয়ার মূল শর্তই হলো ঈমান-আকিদার সর্বব্যাপী চর্চা ও সংরক্ষণ করা। আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বে হেফাজতে ইসলাম ধর্মপ্রাণ জনতাকে সাথে নিয়ে সমকালীন ফিতনা এবং ভোগবাদী ও বস্তুবাদী অপশক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ঈমান-আকিদার চর্চা ও সংরক্ষণের লড়াই করে যাচ্ছে।

জনগণ যখন ঈমান-আকিদার ব্যাপারে উদাসীন বা অসচেতন হয়ে পড়ে, সেই সুযোগে রাষ্ট্রক্ষমতায় জালিম শাসকের অধিষ্ঠান সম্ভব হয়- এটা এক ধরনের খোদায়ী অভিশাপ। আল্লাহর জমিনে বাস করে এবং তাঁর অপার নেয়ামত ভোগ করে বান্দা কর্তৃক অবাধ্যতা ও বিরোধিতা কখনোই আল্লাহ তায়ালা বরদাশত করেন না। ঈমান-আকিদা চর্চার ফলে শাসক ও শাসিত উভয়ের মধ্যেই তাকওয়া বা আল্লাহভীতি সৃষ্টি হয়, ফলে জনগণ যখন ঈমান-আকিদার চর্চা করে, তখন তাকওয়ার কল্যাণে শাসকের পক্ষেও জুলুম-শোষণের পথে পা বাড়ানো সম্ভব হয় না। তাই ঈমান-আকিদার চর্চা এবং এর রক্ষণাবেক্ষণের কর্তব্যকে হেফাজত রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে অবশ্য পালনীয় মনে করে। বিপুল ত্যাগ স্বীকার এবং প্রাণদানের মাধ্যমে হেফাজতে ইসলাম ঈমান-আকিদা রক্ষার আপসহীন লড়াইয়ের পথ ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কায়েমি স্বার্থান্বেষী সব রাজনৈতিক শক্তির বিকল্প হিসেবে নিজের সম্ভাবনাকে ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

হেফাজতে ইসলাম ভুঁইফোঁড় কোনো সংগঠন নয়। হেফাজতের উত্থান এবং শাপলা চত্বরে অপরিমেয় ত্যাগ স্বীকারÑ ইতিহাস-বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনাও নয়; অধিকন্তু উপমহাদেশের ওলামায়ে কেরামের বিশাল এক সংগ্রামী ও আত্মদানের ইতিহাসের ধারাবাহিকতারই নব উপাখ্যান সৃষ্টি হয়েছে। স্বেচ্ছাচারী রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে মজলুম জনতার সঙ্ঘবদ্ধ সংগ্রামের প্রেরণা নিয়ে প্রতি বছর ঐতিহাসিক ৫ মে ফিরে আসে। এই প্রেরণা যুগে যুগে মানবিক ও নাগরিক মর্যাদা নিয়ে ঈমান-আকিদায় পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে বাঁচার তাগিদে সংগ্রামী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বারবার উজ্জীবিত করে তুলবে।

শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের রক্ত ও প্রাণ বিসর্জন বৃথা যাবে না ইনশাআল্লাহ। ইতিহাসের পর্যালোচনায় দেখা যায়, পলাশীর বিপর্যয়ের পর একের পর এক ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনগুলো, তথা ফরায়েজী আন্দোলন, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার ধ্বংস, বালাকোটের শাহাদতবরণ, রক্তাক্ত সিপাহি বিদ্রোহ কোনোটিই শেষ বিচারে ব্যর্থ হয়নি, বরং উপমহাদেশের ওলামায়ে কেরামের এই সুদীর্ঘ রক্ত, আত্মদান ও শাহাদতের পথ ধরেই ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির কবল থেকে ভারতকে স্বাধীন করা সম্ভব হয় এবং যথাক্রমে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সৃষ্টির পথ সুগম হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র তথা পাকিস্তান বানানো গেলেও সেটা ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি ইসলামি সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি। ঠিক তেমনই পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জুলুম-শোষণের নিগড় থেকে মুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে ৯ মাসের রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় হলেও এখানে মানবাধিকার, নাগরিক অধিকার ও ন্যায়-ইনসাফ নিশ্চিত করে একটি শোষণ-বঞ্চনাহীন সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার স্বপ্ন অপূর্ণ রয়ে গেছে। তবে হেফাজতের রক্ত ও প্রাণ বিসর্জনের বদৌলতে এ দেশে শোষক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নিপীড়িত সাব-অলটার্নরা ঈমানি শক্তিতে বলীয়ান হয়ে রুখে দাঁড়ানোর হিম্মত অর্জন করেছে।
বাংলাদেশে বিশুদ্ধ কুরআন-হাদিস ও ইসলামি জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হলো কওমি মাদরাসা; আর এই কওমি মাদরাসার আলেম ও ছাত্র-শিক্ষকরাই ন্যায়-ইনসাফ ও শান্তির পক্ষে এবং সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, দুর্নীতি, জুলুম ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কুরআন-হাদিসের বাণী প্রচার করে যাচ্ছেন। তারাই শাহ ওয়ালীউল্লাহর সংগ্রামী আদর্শ ও চেতনা ধারণ করে অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ-সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন।

১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবের পর উপমহাদেশে আলেম সমাজের ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র প্রতিরোধযুদ্ধ কিছুটা স্তিমিত হলেও তারা ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা-চেতনা, ইসলামি শিক্ষা, মূল্যবোধ ও দ্বীনি সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে মাদরাসা স্থাপনের কাজে ব্যাপৃত হন। হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা কাসেম নানতুবী (রহ:) ১৮৬৬ সালে ওলামায়ে কেরামের বহুল কাক্সিক্ষত প্রথম মাদরাসা বিশ্ববিখ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা করেন। উল্লেখ্য, মাওলানা কাসেম নানতুবী (রহ:) সিপাহি বিদ্রোহের সময় ঐতিহাসিক থানাভবন ফ্রন্টে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। পরে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। তিনি সুকৌশলে গ্রেফতার এড়িয়ে তার কার্যক্রম গোপনে অব্যাহত রাখেন। পর্যায়ক্রমে এই ধারার অজস্র মাদরাসা সমগ্র উপমহাদেশে গড়ে ওঠে। বাংলাদেশে এগুলো ‘কওমি মাদরাসা’ নামে পরিচিত। বিশেষত চট্টগ্রামের হাটহাজারী এলাকায় বাংলাদেশের বৃহত্তম কওমি মাদরাসা তথা দারুল উলুম হাটহাজারী মাদরাসা ১৮৯৬ সালে স্থাপিত হয়। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও সর্ববৃহৎ কওমি মাদরাসা। এই মাদরাসার বর্তমান মুহতামিম শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী (দা.বা.)। তিনি দেওবন্দ মাদরাসার সাবেক শায়খুল হাদিস, আওলাদে রাসূল সা: সাইয়েদ হোসাইন আহমদ মাদানীর একজন সুযোগ্য ছাত্র ও শিষ্য এবং আধ্যাত্মিক জগতে তার খেলাফত লাভ করেছেন।

শায়খুলহিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসানের ইন্তেকালের পর দেওবন্দ থেকে পরিচালিত ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম ত্যাগী যোদ্ধা ছিলেন সাইয়েদ হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ:)। অসহযোগ আন্দোলন থেকে শুরু করে ভারত স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত মাওলানা মাদানীর সংগ্রাম অব্যাহত থাকে। দখলদার ইংরেজ রাজশক্তি কর্তৃক ১৯২১ সালের ২৬ ডিসেম্বর করাচির খালেকদিনা হলে এক নিবর্তনমূলক মামলার শুনানিতে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মাওলানা মাদানী নির্ভীক চিত্তে বলেছিলেন : ‘‘ধর্মীয় উত্তেজনার ফলে ১৮৫৭ সালে ভারতে সর্বত্র যখন বিপ্লবের আগুন জ্বলে উঠেছিল, তখন রানী ভিক্টোরিয়া অর্থাৎ ইংরেজ সরকার ভারতীয়দেরকে যে প্রতিশ্রুতি ও ঘোষণা প্রচার করে তাদের সান্ত্বনা দিয়েছিলেন, তাতে উল্লেখ ছিল, ‘কারো ধর্মের ওপর কোনো হস্তক্ষেপ করা হবে না, বরং ধর্মীয় বিষয়ে দেশবাসীর পূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে।’ ব্রিটিশ পার্লামেন্টেও তা স্বীকৃত হয়েছিল। এমনকি পরবর্তীকালে সপ্তম অ্যাডওয়ার্ড এবং পঞ্চম জর্জও এ ঘোষণা সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান সরকার যদি রানী ভিক্টোরিয়া, পরবর্তী সম্রাট ও তাদের পার্লামেন্টের প্রতিশ্রুতি ও ঘোষণার কোনো মর্যাদা না দেন আর ভারতবাসীর ধর্মীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপকে সঙ্গত মনে করেন, তাহলে এ দেশের কোটি কোটি মুসলমানকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে যে, তারা মুসলমান হিসেবে বেঁচে থাকতে চায়, না নিরেট ইংরেজের বশংবদ প্রজা হিসেবে। ভারতের ৩৩ কোটি হিন্দুকেও অনুরূপ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মুসলমানদের তরফ থেকে ইংরেজ সরকারকে সতর্ক করে দিতে চাই, যদি সরকার ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ অব্যাহত রাখে, তাহলে মুসলমানেরা নিজের ধর্ম রক্ষার খাতিরে জীবন উৎসর্গ করে দিতেও কিছুমাত্র ইতস্তত করবে না। আর এ জন্য আমিই সর্বাগ্রে জীবন উৎসর্গ করতে এগিয়ে আসব’’ (সূত্র : আজাদি আন্দোলনে আলেম সমাজের সংগ্রামী ভূমিকা, জুলফিকার আহ্মদ কিস্মতি, পৃ: ৪৬-৪৭)। বাংলাদেশের বর্তমান আওয়ামী সরকার বিগত ২০০৮ সালের নির্বাচনে কুরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন পাস না করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর তারা আলেমসমাজ ও তৌহিদি জনতার বিশ্বাস ভঙ্গ করে একের পর এক কুরআন-সুন্নাহবিরোধী পদক্ষেপ নিয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতার নামে দেশকে ধর্মহীন করার উদ্দেশ্যে বিতর্কিত নারীনীতি ও শিক্ষানীতি প্রণয়ন, সংবিধানের মূলনীতি থেকে ‘মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ বাক্যটি বাদ দেয়া, জঙ্গিবাদের ধুয়া তুলে আলেম-ওলামা গ্রেফতার, জেল-জুলুম ও হয়রানি, কওমি মাদরাসা বন্ধের প্রয়াস ইত্যাদি সবই ছিল তৌহিদি জনতার ঈমান-আকিদার জন্য চরম হুমকি। দীর্ঘ দিন ধরে অনলাইন মাধ্যমে গোপনে চলে আসা ইসলামবিরোধী কার্যক্রম রুখতে এবং নবী সা: ও ইসলাম অবমাননাকারীদের বিচারের দাবিতে আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বে হেফাজতে ইসলাম রাজপথে গণ-আন্দোলনের সৃষ্টি করে। শাপলা চত্বরে শহীদদের রক্ত কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ছিল না। তাই এই পবিত্র রক্তধারা বৃথা যাবে না ইনশাআল্লাহ। আমিরে হেফাজত আল্লামা শাহ আহমদ শফী বলেছিলেন, ‘শাপলা চত্বরের গণহত্যার বিচারের ভার আল্লাহর ওপর দিয়ে দিলাম। নিশ্চয়ই তিনি মজলুমের সাথে আছেন। জালিমরা একদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। শাপলা চত্বরে শহীদদের রক্তের পথ বেয়েই এ দেশে একদিন ইসলামের বিজয় ঘটবে, ইনশাআল্লাহ।’ তিনি দলীয় নেতৃবৃন্দ ও তৌহিদি জনতাকে ধৈর্য ধারণ করতে বারবার আহ্বান জানিয়েছেন। উল্লেখ্য, হেফাজতের এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে জাস্টিস আল্লামা ত্বকী উসমানী, ড. ইউসুফ আল কারজাভি, ভারতের দেওবন্দের মুহাদ্দিস ও জমিয়ত সভাপতি আল্লামা সৈয়দ আরশাদ মাদানীসহ বিশ্ব ওলামা যৌথ বিবৃতি দিয়েছিলেন।

বর্তমান সরকারের মন্ত্রীরা ইদানীং অব্যাহতভাবে ইসলাম ও ইসলামি বিধিবিধানের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান করে যাচ্ছেন। ইসলামের ফরজ বিধান হজ নিয়ে কটূক্তি এবং রাসূল সা:-এর নামে চরম অবমাননামূলক মিথ্যাচার, ইসলামে নিষিদ্ধ ‘সুদ’ নিয়ে আপত্তিকর অপব্যাখ্যা, পর্দাবিদ্বেষী বক্তব্য, কওমি মাদরাসার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় কারসাজি ইত্যাদি বর্তমান সরকারের ইসলামবিদ্বেষী অবস্থানকে আরো জোরালো করে তুলেছে।
(লেখাটি ২০১৫ সালে লিখিত বিশেষ কলাম)

লেখক : সাংগঠনিক সম্পাদক, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ

Post a Comment

[blogger]

Contact Form

Name

Email *

Message *

Powered by Blogger.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget