ফিরে দেখা হেফাজত: সেদিনের সুযোগ-সন্ধানীরা আজও বিদ্যমান

ইতিহাসের সেই ২০১৩ সাল। উত্তপ্ত রাজনীতির রোষানলে দাউ দাউ করে জ্বলছিল পুরো দেশ। দেশদ্রোহী রাজাকারের অভিযোগে একের পর এক ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলানো হচ্ছিলো জামা‌ত নেতা‌দের। বিরোধীদল বিএনপির জন্য আন্দোলনে নামা ছিল বড় দুষ্কর। সুযোগ মত পেলেই গ্রেফতার, এরপর রিমান্ড। ফলে তারা শক্ত‌িশালী হওয়া সত্ত্ব‌েও ‌ছিল নিষ্ক্রিয়। এদিকে রাজাকারদের ফাঁসির দাবিতে ঢাকার শাহবা‌গে গড়ে ওঠে গণজাগরণমঞ্চ। তাদের দেখা‌দে‌খি অপরাপর জেলাগুলোতেও গড়ে ওঠে গণজাগরণমঞ্চের শাখা। পুরো দেশ রাজাকারদের ফাঁসির দাবিতে প্রকম্পিত করে তুলেছিল তারা। প্রথম দিকে নিজস্ব গতিতে চললেও কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর তাদের দাবী ঘুরে গিয়ে ধর্মভি‌ত্তিক রাজনী‌তি নি‌ষি‌দ্ধের দাবীও যুক্ত হয়। একপর্যা‌য়ে তাদের অনেকেই ইসলাম ধর্মের অবমাননা শুরু করে এবং রাসূল সা. এর ব্যঙ্গ করতে থাকে। নারী-পুরু‌ষের এক‌ত্রে রা‌ত্রিযাপন ও অবাধ মেলা‌মেশায় গণজাগরণমঞ্চ একপর্যায় বেহায়াপনা ও বেলেল্লাপনার আখড়ায় পরিণত হয়।

তাদের এমন অবস্থা ও অবস্থান দেখে ঘরে বসে থাকতে পারেননি শায়খুল আরব ওয়াল আযম আল্লামা হোসাইন আহমদ মাদানী রহ. এর খাছ শাগরিদ, বাংলার সিংহপুরুষ, শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী হাফিযাহুল্লাহ। তিনি বাংলাদেশের শীর্ষ ওলামা-মাশায়েখ এবং ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের সাথে নিয়ে নবীর ইজ্জত রক্ষার্থে তথাকথিত গণজাগরণমঞ্চের বিরুদ্ধে এবং নাস্তিক ব্লগার‌দের সর্বোচ্চ শা‌স্তি ফাঁসির দাবিসহ মোট ১৩ দফা দাবি নিয়ে দেশের প্রতিটি জেলায় আন্দোলন গড়ে তোলেন। আন্দোলনের তীব্রতা এবং তাওহীদি জনতার গণজাগরণ দেখে সরকার হত‌বিহ্বল হ‌য়ে পড়‌ে। বাংলার জমিনে এমন আন্দোলনের দ্বিতীয় কোন নজির ছিল না। হেফাজতের অগ্রগ‌তি আটকা‌তে পা‌রে‌নি কেউ। কারণ এ আন্দোলন ছিল ঈমান, ইখলাস ও নবীপ্র‌ে‌মের। এরপরও আওয়ামী সরকার হেফাজ‌তের দাবী না মে‌নে উ‌ল্টো প্রশাসনিক সু‌বিধার মাধ্য‌মে শাহবাগী‌দের সা‌পোর্ট ‌দি‌তে থা‌কে এবং হেফাজতের বিরুদ্ধে তাদেকে খেপিয়ে তোলে।

এমন একটি মুহুর্তে সুযোগসন্ধানী হয়ে হেফাজত নেতাদের পিছু নেয় বিএনপি ও জামাত‌। সরাস‌রি টাইমলাই‌নে না এ‌সে বি‌ভিন্ন সু‌যোগ-সু‌বিধা দেয় হেফাজ‌তের সমা‌বে‌শে। এমন‌কি মুরুব্বীদের অগোচরে কিছু হেফাজত নেতাদের সাথে আতাঁত করতে সক্ষম হয়। ক্ষমতালোভী ও রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত কিছু আলেম তাদ‌ের দেয়া অফার ও সু‌যোগ সু‌বিধা গ্রহণ ক‌রে।

এভা‌বে চল‌তে চল‌তে একপর্যায়ে আন্দোলনের না‌স্তিক‌বিরোধী আন্দোলনের একটা অংশ সরকার পতন আন্দোলনে রূপ নেয়। হেফাজতের পুরো আন্দোলনটা ঘোলাটে করে নি‌জে‌দের ম‌তো ব্যবহার ক‌রে ক্ষমতালোভি সেই মহলটি।

বিশেষ করে ৫ মে ঢাকা অব‌রো‌ধে লক্ষ লক্ষ তৌহিদী জনতা ঢাকার রাজপথে বি‌ভিন্ন প‌য়েন্ট‌ে অবস্থান করছিল। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি ঘোষণা দেয় নেতা-কর্মীদের হেফাজতের পা‌শে দাঁড়া‌তে। তাঁর এই বক্তব্যে আওয়ামী সরকার আতঙ্কিত ও ন‌ড়েচ‌ড়ে বস‌লে হেফাজতকে সন্ধ্যার আগেই শাপলাচত্তর ত্যাগ করার নির্দেশ দেয়। এদিকে সরকারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাসূল সা. এর ইজ্জত রক্ষার্থে দাবি আদায়ের জন্য ময়দান ছাড়তে রাজি নয় হেফাজতের সরল মুখ‌লিস ওলামামাশায়েখ ও তাওহীদি জনতা। পরামর্শক্রমে এবং বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে রাত্রিযাপনের ঘোষণা দেয় হেফাজত নেতৃবৃন্দ।

অন্যদিকে হেফাজতের কিছু ক্ষমতালোভী নেতা বিএনপির সাথে আঁতাত করে গদি দখলের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে এবং আন্দোলনের মোড় ভিন্নভা‌বে নেয়ার অপচেষ্টা চালায় এবং তাওহী‌দি জনতাকে রাত্রিযাপনের ব্যাপা‌রে বোঝা‌তে সক্ষম হয় তারা। এ‌দি‌কে পরেরদিন রাত পেরোলেই ৬ মে ঢাকায় পল্টনে বিএনপির জনসভা। তাদের লক্ষ্য ছিল, রাত অতিবাহিত হলে হেফাজতের জনসমুদ্র‌ে সকলেই যোগদান করবে। দল ভারি করে সরকার পতনের শেষ ঘণ্টা বাজাবে তারা! কিন্তু আওয়ামী সরকার তা আঁচ কর‌তে পেরে। হা‌তে নেয় নতুন প্লান। আর ক্ষমতা‌লোভী দু'দলের খেলার গু‌টি হয় হেফাজ‌তের নিষ্পাপ-নিরাপরাধ কর্মীরা।

হেফাজত কর্মীদের উপর ৬ মে রাত দু'টায় ধর্মপ্রাণ তাওহিদী জনতার কেউ যখন তাহাজ্জুদে আর কেউ বিশ্র‌াম কর‌ছে ঠিক সে সময় বিদ্যুৎ সং‌যোগ বিচ্ছিন্ন ক‌রে তাওহিদী জনতা এবং আলেম-ওলামা পীর-মাশায়েখদের উপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ চলায় সম্মিলিত বাহিনী। নে‌মে আস‌ে তাঁদের উপর ভয়াবহ কেয়ামত। যৌথবা‌হিনী ও আওয়ামী সরকা‌রের পোষা কুকুরগুলো হাম‌লে প‌ড়ে তা‌দের উপর। ই‌তিহা‌সের বর্বরতম পাশবিক নির্যাতন করে রাতেই ঢাকা ত্যাগ করতে বাধ্য করে আওয়ামী সরকার।

যৌথবা‌হিনী রাতভর মুহুর্মুহু গু‌লি ও হামলা চা‌লি‌য়ে শতাধিক মুসল্লীকে শহীদ এবং হাজার হাজার আলেম-ওলামা ও তাওহিদী জনতাকে আহত ও পঙ্গু ক‌রে দেয়। এমন বর্বরো‌চিত হামলা স্বাধীনতার পর বাংলার জমিনে দ্বিতীয়বার সংঘটিত হয়নি। সে ক্ষত এখ‌নো আ‌ছে, থাক‌বে সারা জীবন!

এ অমানবিক হামলার দায় যেমনটি আওয়ামী সরকারের, ঠিক তেমনটি বিএনপি-জামাত জোটের। কিয়ামতের দিন উভয় ক্ষমতাধরকে আল্লাহর কাঠগড়ায়  দাঁড়াতে হবে। দাঁড়াতে হবে ঐ সমস্ত ক্ষমতালোভীদেরও যারা সেদিন হেফাজতের ভেতরেই ঘাপটি মেরে ছিল। সেইদিন আল্লাহ তাআলা এর উপযুক্ত বিচার করবেন ইনশাআল্লাহ।

৫ মে হামলার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত হেফাজত থেকে স্বার্থ হাসিলের অপচেষ্টা চালিয়েছে বিএনপি-জামাত। একথ‌া ব‌াস্তব‌ যে, সেদিন সরকার পতনের জন্য হেফাজতকে ব্যবহার করতে চেয়েছে বিএনপি। এদিকে আওয়ামী সরকার বিএনপির অবস্থান জেনে ক্ষমতার জন্য অমানবিক নির্যাতনের মাধ্যমে নির্দোষ নিরাপরাধ তাওহিদী জনতা এবং আলেম- ওলামাদের শাপলা চত্বর ছাড়তে বাধ্য করে।
যোগ বি‌য়োগ কর‌লে একথা প‌রিষ্কার, হেফাজতকে ক্ষমতার জন্য উভয় দল ব্যবহার করেছে। কেউ গদির পাওয়ার জন্য, কেউ গদি রক্ষার জন্য।

গতানুগতিক কথা বলছি না। এ বিষয়ে হেফাজতে শীর্ষ এক নেতার  ভিডিও সাক্ষাৎকার আমার কা‌ছেও আছে। সেখানে তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, ফরহাদ মজহারের উপস্থিতিতে বেগম জিয়ার সম্মতিক্রমে আমি এই হাতে ইসলামী রাষ্ট্রের রূপরেখা লিখেছি।
তিনি আরো বলেন, হাটহাজারী হযরতকে বলেছি, হুজুর কোন চিন্তা করবেন না, পরশু আপনি হবেন রাষ্ট্রপতি এবং বেগম জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী করে আমরা ইসলামী হুকুমত কায়েম করবো।
তিনি আরো বলেন, অপারেশন চলাকালীন অর্থাৎ ৫মে রাতে বারবার হুজুর আমাকে বলেন ‌‌'এখন কী করব?' আমি হুজুরকে বলেছি, আপনি চিন্তা করবেন না।
হেফাজত নেতা বলেন, হঠাৎ আমি শুনতে পাই হুজুর নাকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলে দুটি টিকিট সংগ্রহ করে চট্টগ্রাম চলে যাচ্ছে। এ কথা বলে দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, কেন হুজুর চলে গেলেন তিনি না গেলে কেউ কী তাঁকে জোর করে নিয়ে যেতে পারতো?
হুজুর যদি ওই রাতে না গিয়ে মিডিয়ার সামনে বলতো ভাইয়েরা, তোমরা যে যেখানে অবস্থান করছো তোমরা থাকো, ইনশাআল্লাহ  সকালে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। তাহলে পরের দিন আমরা ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করতে পারতাম।

সে হেফাজত নেতার কথায় সুস্পষ্ট বোঝা যায়, তারা তাওহিদী জনতার আস্থা, বিশ্বাস ও রক্তের সাথে গাদ্দারী করে নিজেদের বিক্রি করে দিয়েছিল। না হয় বেগম জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী করে ইসলামী রাষ্ট্র কায়েমের স্বপ্ন দেখে কী করে?

যুগে যুগে এভা‌বে ক্ষমতালোভী আলেমই নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ইসলামকে কুলষিত করেছে।  

আমরা দেখেছি
-ক্ষমতার জন্য কাউকে তারা রাবেয়া বসরী উপাধি দিতে দ্বিধা‌বোধ করে না।
-আবার বেগম জিয়াকে গদিতে বসিয়ে ইসলামী রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতেও তাদের বুক কাঁপে না।
-আবার কেউ কওমী জননী উপাধি দিতেও পরোয়া করে না।
-কেউ ক্ষমতা ও পদের লোভে গোমরাহী আকীদা পোষণকারীদের অনুসরণ-অনুকরণ করে।
-কখনো স্বার্থ হাসিলের জন্য কওমী মাদরাসার ইতিহাস-ঐতিহ্য ও স্বকীয়তা ভূলুণ্ঠিত করতেও তারা দ্বিধাবোধ করে না।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বিএনপি যদি সেদিন তাদের চক্রান্তে স্বার্থক হতো, হেফাজত‌কে সিঁ‌ড়ি হি‌সে‌বে ব্যবহার কর‌ে নতুন সরকার গঠন কর‌তো, তার পরও আলেম-ওলামাদের নেতৃত্ব প্রদান তো দূরের কথা বরং বি‌ভিন্ন মামলায় হেফাজতকে জেলে ভরে তারা একক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতো।

পরিশেষে, মহান আল্লাহর কাছে মিনতি করি, মুসলিম জাতিকে যেন আদর্শিকভাবে পদস্খলন না করেন। ঈমান এবং নীতি-নৈতিকতার উপর অটুট রাখেন।

লেখক: শিক্ষার্থী, দারুল উলুম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।

Post a Comment

[blogger]

Contact Form

Name

Email *

Message *

Powered by Blogger.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget