৬ মে: আমার দেখা হাটহাজারী ট্রাজেডি



৫ মে রাতের ভয়াবহ নারকীয়  হামলার খবরে সারাদেশের মত হাটহাজারীবাসীও মর্মাহত। শোকে কাতর সবাই। রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা। রাস্তার মোড়ে মোড়ে পুলিশি পাহারা। সবার মাঝে আতংক আর উৎকণ্ঠা। বিভিন্ন জনকে নাজেহাল করার খবরও পাওয়া যাচ্ছে। নিরাপত্তা বলতে কোন কিছু আছে বল মনে হচ্ছিল না।

৫ মে শাপলার মোবারক মজমায় আমরা যারা শরীক হতে পারিনি তারা ৬ মে ক্লাসে বসে বিভিন্ন দুআ দরুদ পড়ছিলাম। সবার মাঝে চাপা ক্ষোভ। প্রতিশোধের আগুনে সবাই দগ্ধ হচ্ছে। সকাল থেকে আমাদের সাথেই ছিল শাহাদাত। বিভিন্ন আমলে শরীক হলো। অনেক সময় বসে বসে গল্প করলাম। রাতের নৃশংসতার কথা স্মরণ করে কেঁদে উঠেছিল। দুপুরের বিরতিতে বাড়িতে গিয়েছিল খাবার খেতে। পরিস্থিতি বিবচনায় আমরা নিষেধ করলাম। আজকের খবারে আমাদের দস্তরখানায় শরীক হওয়ার আমন্ত্রণ জানালাম। কিন্তু, শাহাদাতের পিয়ালা হাতে বেহেশতের হুর যখন আহবান জানায় তখন দুনিয়ার সকল কিছুই তুচ্ছ মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। কোন বাধা বা সম্পর্ক শাহাদাতকে ফিরাতে পারলো না। কিন্তু এটাই যে শেষ যাওয়া তাও জানা ছিল না। প্রতিদিনের মত দুপুরের খাবার খেয়ে মাদ্রাসার পথ ধরেছে "শাহাদত হোসেন"। 

হাটহাজারী বাসস্ট্যান্ডে  পৌঁছাতেই খবর পেলো আল্লামা শাহ আহমাদ শফীকে গ্রেফতার করেছে প্রশাসন। থমকে দাঁড়ায় শাহাদত। এমন দুঃসংবাদ কোনভাবেই মেনে নিতে পারে না। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে রাস্তার পাশে। কী করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না! এমন সময় দেখতে পায় হাজার-হাজার তৌহিদী জনতা প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে এসেছে। নারায়ে তাকবিরের ধ্বনিতে আকাশ-বাতাশ প্রকম্পিত করে তুলছে। 

শাহাদাত চৈতন্য ফিরে পেল। সারা শরীরে তারুণ্যের প্রবাহ বয়ে গেল। প্রতিশোধের দিপ্ত শপথ নিল। আল্লাহ, রাসূল ও দীনের ধারক-বাহক উলামায়ে কেরামের বিরুদ্ধাচারণকারীদের শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরবে না। প্রয়োজনে শহিদ হবে, তবুও পিছু হাটবে না। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। মুষ্টিবদ্ধ হাত। হৃদয়ে শাহাদাতের তামান্না। দু'চোখে জান্নাতের স্বপ্ন। যেন হুরদের হাতছানি আর দুই কানে ভেসে আসছে  গিলমানদের অভ্যর্থনা। মুখে নাস্তিকদের বিরুদ্ধে শ্লোগান। ছুটে গিয়ে শরীক হলো মোবারকময় মিছিলে। মিসে গেলো শহিদী তামান্নায় উজ্জবিত  হাজারো মানুষ ভিরে। মনের একটাই আশা, হয়তো শাহাদত, না হয় রাসূলের দুশমনের ফাঁসি। 

চলছে প্রতিবাদ মিছিল। মেখল থেকে হাটহাজারীর পথ খানিকটা দূর হওয়ায় আমরা যেতে একটু দেরি হয়ে যায়। আমি থানার সামনে আর মিছিলকারীরা হাটহাজারী মাদ্রাসার সামনে। পুলিশের এলোপাথাড়ি গুলিবর্ষণ। চোখের সামনে যেন কিয়ামতের বিভীষিকা। চারপাশ অন্ধকার। মুহূর্তে ভয়াল পরিস্থিতি। আমরা কয়েকজন কলেজ গেটের দিকে মোড় নিলাম কাচারি রোড হয়ে। মুখে শ্লোগান বুকে ঈমানী বল।

বর্তমান  আমির এরশাদ প্লাজার সামনে যেতে না যেতেই আমাদের উপর গুলিবর্ষণ আর টিয়ারশেল নিক্ষেপ শুরু হলো। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে নিজেকে মার্কেটের এক গলিতে আবিস্কার করি। এভাবেই ফিল্মি স্টাইলে নবীপ্রেমিক তৌহিদী জনতার আবেগ আর ভালোবাকে বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝড়া করে দেয়ার চেষ্টা করা হলো। ঝরে পড়লো ৬টি তরুতাজা প্রাণ। জীবনের তরে পঙ্গু হয়ে যায় বেশ কিছু রাসূল প্রেমিক। মুহুর্মুহু গুলির শব্দে ভারি হয়ে ওঠে ইলমের নগরী হাটহাজারীর আকাশ-বাতাশ। ডুকরে কেঁদে উঠে হাজারো পরিবার।

সেদিন শহীদ হয় প্রিয় বন্ধু শাহাদাত। সেই স্মৃতি আজো আমায় কাঁদায়। আজো বাতাসের সাথে ভেসে আসে টিয়ারশেল আর বারুদের গন্ধ। চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই হায়েনাদের পৈশাচিক উল্লাস। মুহুর্মুহু গুলির শব্দে এখনো কানে ভাসে। যখনই প্রিয় বন্ধুর গুলিবিদ্ধ শরীরটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে তখনই ডুকরে কেঁদে উঠি। অনুশোচনার আগুনে দগ্ধ হই। লজ্জায় দু'চোখ বেয়ে নেমে আসে অশ্রুর ধারা।

হে শহিদ বন্ধু, ক্ষমা করে দিয়ো! তোমার জন্য আমরা কিছু করতে পারিনি। বিচার চাওয়ার পরিবর্তে নিমকহারাম কিছু গাদ্দারকে আঁতাত করতে দেখেছি। শহীদদের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে বিক্রি হতে দেখছি মঞ্চ কাঁপানো অনেক মুনাফিককে। একটা আসন পাবার আশায় খুনিকে জননী ডাকতে দেখেছি। খুনির সামনে দাঁড়িয়ে বিচার চাওয়ার বিপরীতে  দাঁত কেলিয়ে মনোরঞ্জন করতে দেখছি প্রতিনিয়ত। এত এত হতাশার মাঝেও বিচারের আশায় আজ অপেক্ষায় করছি। কারণ,  আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘লা তাহযান’ হতাশ হয়ো না। আমি হাতাশ হইনি। আর মুমিন কখনো হতাশ হতে পারে না। দুআ করি আল্লাহ তোমাকেসহ সকল শহিদদের কবুল করুন।

লেখক: শিক্ষার্থী, হাটহাজারী মাদরাসা চট্টগ্রাম।

Post a Comment

[blogger]

Contact Form

Name

Email *

Message *

Powered by Blogger.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget