নিভৃতচারী বুজুর্গ মুফতী মুহাম্মদ আলী কাসেমী; একজন আদর্শ মোহতামীমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত


জুনাইদ আহমদ  
মেখল মাদরাসার সিনিয়র মুফতী হযরত আল্লামা মুফতী মুহাম্মদ আলী কাসেমী হাফিযাহুল্লাহু। আমার প্রাণপ্রিয় উস্তাদ ও মুরুব্বি। আজ থেকে প্রায় একযুগ আগে আমি ছোট্ট জুনাইদ  মেখল মাদরাসায় ভর্তি হওয়ার পর মুফতী সাহেব হুজুরের পিতৃ স্নেহ ও সার্বিক তত্বাবধানে দীর্ঘ সাত বছর লেখাপড়া করেছি,আলহামদুলিল্লাহ। জামাতে মিজান থেকে হেদায়া ১ ম বর্ষ পর্যন্ত, ছয় বছর মুফতী সাহেব হুজুরের খেদমত ও সাহচর্যে ছিলাম।

মেখলের পড়াশোনা শেষ করে হাটহাজারী মাদরাসায় আসার পরও মুফতী সাহেব হুজুরের সাথে আমার সম্পর্কের ভাটা পড়েনি। সপ্তাহে দু'চার বার সাক্ষাৎ হয়।হুজুর মেখল থেকে হাটহাজারীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেই ফোন দিয়ে বলেন- জুনাইদ! আমি হাটহাজারী আসতেছি।দেখা হতে পারে। দু'একদিন অন্তর অন্তর  মোবাইল ফোনেও কথা হয়। আমি ফোন দিতে না পারলেও মুফতী সাহেব নিজ থেকেই ফোন করে খবর নেন। ছাত্র-উস্তাদ নয় এ যেন পিতা-পুত্রের অকৃত্তিম সম্পর্ক। 

মোবাইলে নিয়মিত কথা হলেও করোনা ভাইরাস,লক ডাউন ইত্যাদির কারণে প্রায় দেড় দুইমাস যাবত মুফতী সাহেব হুজুরের সাথে সাক্ষাতের কোন সুযোগ হচ্ছিল না । মনটা ছটফট করছিলো কখন যে মুফতী সাহেব হুজুরের সাথে সাক্ষাৎ করবো! ক'দিন ধরে সাক্ষাত করতে যাবো যাবো করেও যাওয়া হচ্ছিল না। গত জুমাবার গিয়েছিলাম হুজুরের সাক্ষাৎলাভে 
ধন্য হতে।

জুমার পর হুজুর নিজ প্রতিষ্ঠিত মেখল এশায়াতুস সুন্নাহ মাদরাসায় বিশ্রাম করছিলেন। সালাম দিয়ে হুজুরের কামরায় প্রবেশ করা মাত্রই আমার কণ্ঠস্বর শুনে হুজুর বিশ্রাম ছেড়ে উঠে গেলেন। আগ বাড়িয়ে এসে মুসাফাহার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন। কতটা উদার মনের মানুষ হলে- একজন উস্তাদ নিজ ছাত্রের স্নেহে বিশ্রাম ছেড়ে এগিয়ে এসে মুসাফাহার জন্য হাত বাড়িয়ে দিতে পারেন! আল্লাহু আকবার। এতে শেখার আছে বহুকিছু। সত্যিই মাটির  মানুষ আমার উস্তাদ মুফতী মুহাম্মদ আলী কাসেমী দা.বা.। 

আমার হাল পুরসি করলেন। খাদেমকে ডেকে নাস্তার ব্যবস্থা করতে বললেন। নাস্তা ছিলো আম,আনারস ইত্যাদি  ফলফলাদি। হুজুরও আমার সাথে একই দস্তরখানায় বসলেন। একাধিক গাছের আম ছিলো প্লেটে। কোনটা মিষ্টি আবার কোনটা হালকা টক। প্লেট থেকে হুজুর নিজ হাতে আমাকে আম তুলে দিচ্ছিলেন।আর বলছিলেন- এটা খাও, এটা বেশি মিষ্টি হবে । আমগুলো ছিলো অনেক সুস্বাদু। জিজ্ঞাসা করলাম আমগুলো মাদরাসার গাছের কিনা ? মুফতী সাহেব হুজুর উত্তর দিলেন- হ্যাঁ এগুলো মাদরাসার গাছের আম তবে আমি মাদরাসা থেকে টাকা দিয়ে কিনে নিয়েছি।আমের মূল্য যত টাকা আসে তা আমি মাদরাসায় দিয়ে দিয়েছি।

আশ্চর্য হলাম! নিজের জায়গা জমিনে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা। তিনি মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা-মোহতামীম। এরপরও মাদরাসার গাছের কয়েকটা আম সেগুলোও কিনে নিতে হয়! কয়েকটা আম কি তিনি মোহতামীম হিসেবে টাকা ছাড়াই খেয়ে নিতে পারতেন না ? মাদরাসার হকের ব্যাপারে এতটাই গুরুত্ববান তিনি! আল্লাহু আকবার....।

তিক্ত হলেও সত্য যে, বহু মোহতামীম হযরত মাদরাসাকে নিজ পৈত্রিক সম্পত্তি মনে করে লুটেপুটে খান। এমন খবরও ভুরি ভুরি শুনা যায়। কিসের মাদরাসার হক আর কিসের কি,সবই যেন নিজের। মাআজাল্লাহু...

দীর্ঘ ছয় বছর আমি মুফতী সাহেব হুজুরের খেদমতে ছিলাম। মাদরাসার হকের ব্যাপারে হুজুরকে সর্বোচ্চ সতর্ক ও গুরুত্ববান দেখেছি। বহু সময় দেখতাম- পকেট থেকে টাকা বের করে বলতেন এ টাকাগুলো তো  আমার নয় মনে হচ্ছে। এগুলো মাদরাসার জন্য কেহ দিলো কিনা। টাকাগুলো তো সন্দেহপূর্ণ হয়ে গেলো। এই বলে সেই টাকাগুলো মাদরাসায় দিয়ে দিতেন।

স্বচক্ষে দেখেছি- অফিসের ড্রয়ারে বা নিজ পকেটের কোন টাকার ব্যাপারে সন্দেহ হলে সেগুলো কিসের টাকা তা পরিপূর্ণ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সেগুলো আলাদা করে রেখে দিতেন।

মুফতী মুহাম্মদ আলী কাসেমী সাহেব হুজুর আমার কলিজার টুকরা উস্তাদ। ছোট্ট শিশুকে যেভাবে হাত ধরে হাঁটতে শেখানো হয় ঠিক সেভাবেই মুফতী সাহেব হুজুর আমাকে লেখালেখির ময়দানে হাঁটতে শিখিয়েছেন। আমার জীবনে মুফতী সাহেব হুজুরকে না পেলে হয়ত কলম হাতে নেওয়া শিখতাম না। মুফতী সাহেব হুজুর থেকে আমি যেই পরিমাণ শিখেছি এর ঋণ পরিশোধ করা কভু সম্ভব নয়। মুফতী সাহেব হুজুরের শানে আমার লিখিত এক কবিতায় লিখেছিলাম- ✍ আমার উপর রয়েছে তোমার বর্ননাতীত অবদান ✍ গায়ে চর্মে পাদুকা বানালেও হবেনা তার সমমান। 

আমার দেখামতে তিনি একজন নিভৃতচারী বুজুর্গ। সব সময় নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পছন্দ করেন। হুজুর কতটা সাদাসিধে তা যারা হুজুরকে দেখেছেন তারাই বলতে পারবেন। তিনি ফার্সী ভাষার একজন পণ্ডিত। বিখ্যাত ইসলামি দার্শনিক আল্লামা শেখ সাদী রহ. গুলিস্তাঁ ও বুস্তা কিতাবের পাঠদানে তার দৃষ্টান্ত বিরল।মেখল মাদরাসায় আরবী সাহিত্যের মাকামাতে হারীরীর মতো কঠিন কিতাবের পাঠদান করেন তিনি। মাকামাতে হারীরী পড়ানোর সময় শব্দের,তাহক্বিক,সীগা,বাহাছ,
বাব,মাদ্দা,জিনস ইত্যাদি এমনভাবে তুলে ধরেন মনে হয় যেন তিনি মিজানের ছাত্রদেরকে সরফ পড়াচ্ছেন। মালাবুদ্দা মিনহু,নাহবেমীর সহ দরসে নেজামীর পাঠ্যসূচির বহু কিতাবের ব্যখ্যাকার তিনি। সদা হাস্যোজ্বল চেহারা। মুফতী মুহাম্মদ আলী কাসেমী সাহেব হুজুর দা.বা. আদর্শ মোহতামীমের একজন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আল্লাহ তায়া’লা হুজুরকে সুস্থতার সহিত দীর্ঘ নেক হায়াত দান করুন, আমিন। 

প্রাক্তণ ছাত্র মেখল মাদরাসা। 

Post a Comment

আমি দুই বছর ওস্তাদের খেদমতে ছিলাম। মানুষ হিসেবে তিনি অত্যন্ত অমায়িক ও কোমল হৃদয়ের অধিকারী। উস্তাদের কথা এখন বারবার মনে পড়ছে। আল্লাহ তাকে নেক হায়াত দান করুক। আমিন।

[blogger]

Contact Form

Name

Email *

Message *

Powered by Blogger.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget