Articles by "মতামত"

আব্দুল্লাহ আল মাসনুন:বাংলাদেশের ক্ষণজন্মা একজন মহামনীষী হচ্ছেন আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী। ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর অকুতোভয়-সৎসাহসী ও বীর কাণ্ডারী এই আলেমে দ্বীন একটি ঐতিহ্যময় ও ইলমী-দ্বীনী পরিবারের একজন সুসন্তান। উনার পরিবারের সুখ্যাতি ও  বংশ মর্যাদা পুরো দেশ জুড়ে সমাদৃত এবং মানুষের কাছে গৌরবান্বিত।  পারিবারিক  সিলসিলায় আল্লামা বাবুনগরী অত্যন্ত প্রখর মেধা এবং বিরল প্রতিভার অধিকারী একজন স্বনামধন্য মুহাদ্দিস। 

ইলম, আমল, তাযকিয়া, আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া এবং ন্যায়নীতির অনন্য উচ্চশিখরে অধিষ্ঠিত আছেন আল্লামা বাবুনগরী।

দেশ ও জাতির সত্যিকারের একজন শুভাকাঙ্ক্ষী এবং মিল্লাতে ইসলামিয়ার একজন পরম হিতাকাঙ্ক্ষী আলেম আল্লামা বাবুনগরী। উনি আজীবন সত্য ও ন্যায়ের পথে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। দেশ-জাতি ও মুসলিম উম্মাহর বৃহৎ স্বার্থে উনি প্রতিনিয়ত নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে আসছেন। উনি সবসময় উম্মাহর কল্যাণ কামনা করেন। যে দিকে ইসলামের বৃহৎ স্বার্থ রয়েছে, উনি সেদিকেই ধাবিত থাকেন। কখনোই তিনি নিজের স্বার্থ দেখেন না, সর্বদা পদ-পদবি ও জাগতিক মোহ থেকে নিজেকে বিরত রাখেন৷ দুনিয়াবি চাকচিক্য ও লোভ-লালসা উনার অন্তরে কখনোই প্রভাব ফেলতে পারে না। 

আল্লামা বাবুনগরীর অতীত ইতিহাস ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে অনেক ত্যাগ স্বীকার করার অসংখ্য ঘটনায় ভরপুর। উনার জীবনের প্রতিটি প্রহর কেটেছে দ্বীন ও মিল্লাতের খেদমতে। উনি নিজেকে সদা নিয়োজিত রেখেছেন ইসলামের সুমহান খাদেম হিসেবে। কর্মজীবনে ব্যস্ত রয়েছেন ইলমে হাদীসসহ অন্যান্য শরয়ী জ্ঞানের পাঠদানে। বিশেষভাবে তিনি ইলমে হাদীস ও উলুমে হাদীসের উপর গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেছেন বিশ্ববিখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা ইউসুফ বান্নুরী রাহ. এর সান্নিধ্যে।  বয়ান-বক্তৃতা ও কাব্য-প্রবন্ধসহ বিভিন্ন লেখালেখির মাধ্যমে প্রতিনিয়ত ইসলামের বার্তা মানুষের সমাজে তুলে ধরছেন এবং তাগুত-বাতিলের যাবতীয় অপতৎপরতার জবাব দিয়ে আসছেন। 

আল্লামা বাবুনগরী কখনোই কোনো বাতিলের সাথে আপোষ করেন না। হক কথা বলতে এবং সত্য উচ্চারণ কর‍তে উনি আপোষহীন। শিরক-বিদআত, কাদিয়ানি ও দুশমনে সাহাবাসহ নাস্তিক্যবাদী অপশক্তির সমুহ কুযুক্তি ও অপব্যাখ্যার দাঁতভাঙা জবাব দিয়ে আসছেন তিনি৷ দেশের স্বাধীনতা এবং দেশের শান্তি টিকিয়ে রাখার জন্য, দেশের মানুষের ন্যায্য অধিকার পূর্ণরূপে আদায়ের জন্য আল্লামা বাবুনগরী সদাসর্বদা সক্রিয়ভাবে ভূমিকা পালন করে আসছেন৷ উনি একজন দেশপ্রিয় বাঙালি নাগরিক। উনি প্রিয় মাতৃভূমির একজন পরম শুভাকাঙ্ক্ষী। দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য উনি খুবই তৎপর থাকেন। 

আল্লামা বাবুনগরীর হৃদয় অত্যন্ত প্রশস্ত।  উনি সাময়িক পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য কৌশলগত কারণে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। উনার চিন্তার প্রখরতা অনেক গভীর৷ উনি স্বপ্ন দেখেন ইসলামি খেলাফতের৷ উনি আজীবন সংগ্রাম করে আসছেন আল্লাহর যমীনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা করার জন্য। ইসলাম বিরোধী সকল অপতৎপরতা এবং তাগুতশক্তির যাবতীয় চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রকে রুখে দিয়ে আল্লাহর দ্বীন কায়েম করে শান্তি-সম্প্রীতির অনন্য নজির স্থাপন করতে চান তিনি। বৃহৎ এ স্বার্থের জন্য তিনি অনেক ক্ষুদ্র স্বার্থ কুরবানি দিয়ে আসছেন। জেল-জুলুম, শারিরীক  নির্যাতন এবং মানসিক নিপীড়ন সহ্য করে আসছেন গত এক দশক ধরে৷ 

এই দেশের ইসলামপ্রিয় তাওহিদী জনতার আশা এবং আস্থার প্রতীক হচ্ছেন আল্লামা বাবুনগরী। ঈমানদীপ্ত তারুণ্যের আশাজাগানিয়া কাণ্ডারী এই আলেমে দ্বীন সত্য ও ন্যায়ের পথে সংগ্রাম চালিয়ে যাবেন ইনশাআল্লাহ। কখনো কোনো কারণে নিরাশ কিংবা হতাশ হওয়ার কিছু নেই। তিনি ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বৃহৎ স্বার্থে এবং মাদ্রাসায় শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ভিডিওবার্তায় অংশগ্রহণ করেছেন। কারো ভুল বুঝাবুঝি যেন না হয়।  উনার ইসলামী চেতনা ও তাগুতের মোকাবেলায় দৃঢ় মনোভাব ছিল, আছে এবং থাকবে ইনশাআল্লাহ।

ভিডিওবার্তায় অংশগ্রহণ ছিল একটি সাময়িক সিদ্ধান্ত। আল্লামা বাবুনগরী উনার আদর্শ ও চেতনা থেকে সরে আসেন নি৷ 
আকাবির-আসলাফের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি আল্লামা বাবুনগরী নিজের কার্যক্রম চালিয়ে যাবেন। জুলুম ও নির্যাতন উনার উপর অতীতেও চালানো হয়েছে, উনি দমে যান নি। বরং উনার প্রতিবাদী কণ্ঠ আরো বেগবান হয়েছে। ইনশাআল্লাহ আজীবন উনার তেজস্বী চেতনা এবং উচ্চকণ্ঠ আরও প্রসারিত হবে। বাতিলের হৃদপিণ্ড কাঁপিয়ে দেবে উনার সাহসী পদক্ষেপ। বিজাতীয় দুশমন ও স্বজাতীয় গাদ্দার মুনাফেকদের কোনো ষড়যন্ত্র আল্লামা বাবুনগরীর অভিযাত্রা রুখতে পারবে না। 


ফাজেল: দারুল উলুম হাটহাজারী মাদ্রাসা।


জুনাইদ আহমদ :   আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া হামিয়ুচ্ছুনাহ মেখল মাদরাসা মহাপরিচালক আল্লামা নোমান ফয়জী সাহেব দা.বা.। তিনি  মুফতীয়ে আজম রহ. এর সুযোগ্য দৌহিত্র (মেয়ের ঘরের নাতি)। উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন ঐতিহ্যবাহী বংশের সন্তান তিনি । আল্লামা নোমান ফয়জী দা.বা. হাটহাজারী মাদরাসার সাবেক মোহতামীম আল্লামা হামেদ সাহেব রহ. এর জামাতা।

আল্লামা নোমান ফয়জী সাহেব দা.বা. হাটহাজারী মাদরাসার মজলিসে শূরার অন্যতম একজন সদস্য। গত ১৭ ই জুন বুধবার হাটহাজারী মাদরাসার মজলিসে শূরার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। উক্ত বৈঠক শেষে এক বিশেষ বিবৃতিতে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী হাফিযাহুল্লাহুর মুঈনে মোহতামীমের পদ ছেড়ে দেওয়ার সম্মতির বিষয়ে আল্লামা নোমান ফয়জী এর বরাতে একটি মিথ্যা বক্তব্য প্রচার করা হয়।

আল্লামা নোমান ফয়জীর দা.বা.এর বরাতে এমন একটি ডাহামিথ্যে বক্তব্য প্রচার হওয়ায় নোমান ফয়জী সাহেব দা.বা. তাৎক্ষণিক এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। অনলাইন পত্রিকা প্রবচনের সম্পাদক কাজী হামদুল্লাহ ভাই আল্লামা নোমান ফয়জী সাহেব হুজুর থেকে মুঠোফোনে এ বিষয়ে একটি অডিও সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। সাক্ষাৎকারে আল্লামা নোমান ফয়জী সাহেব হুজুর জানান, তাঁর বরাতে প্রচারিত বক্তব্যটি মিথ্যা ও ভূয়া।

আল্লামা বাবুনগরী বাবুনগরী সাহেব মুঈনে মোহতামীমের পদ থেকে পদত্যাগের কোন সম্মতি শূরার সদস্যদের নিকট পেশ করেননি এবং আল্লামা নোমান ফয়জী সাহেব হুজুরও বাবুনগরী সাহেবের পদত্যাগের বিষয়ে কোন কথা বলেননি।

প্রবচন মিডিয়ার সৌজন্যে সেই অডিও সাক্ষাৎকারটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফসবুকে ভাইরাল হয়। মিথ্যাচারের বিষয়টি ফাঁস হয়ে যাওয়ায় Kamrul hasan নামের একটি ফ্যাক আইডি থেকে আল্লামা নোমান ফয়জী সাহেব হুজুরের নামে কটুক্তিমূলক একটি পোস্ট করা হয়। এই ফ্যাক আইডি থেকে বিগত সময়েও হাটহাজারীর শীর্ষ ওলামায়ে কেরাম ও তৌহিদি জনতার নামে কটুক্তি করা হয়েছে। 

আল্লামা নোমান ফয়জী সাহেব হুজুরের নামে কটুক্তি করে বলা হয়েছে- তিনি হাটহাজারী মাদরাসার বহিস্কৃত উস্তাদ। মিথ্যাবাদীদের স্পর্ধা কত বড়!তিনি হাটহাজারী মাদরাসার বহিস্কৃত উস্তাদ এমন কথা আমরা আজো শুনিনি। এটা নির্জলা মিথ্যাচার। এমন ডাহা মিথ্যা আল্লামা নোমান ফয়জী সাহেব দা.বা. এর মানহানীর শামিল। আল্লামা  নোমান ফয়জী সাহেব হুজুর ছিলেন হাটহাজারী মাদরাসার স্বনামধন্য একজন শিক্ষক উস্তাদ । 

নোমান ফয়জী সাহেব হুজুরের পিতা আল্লামা মুজাফফর আহমদ (রহ.) মুফতীয়ে আজম রহ. এর পর ১৯৭৬ সন থেকে মেখল মাদরাসার মোহতামীম ছিলেন। ২০০৫ সাল তিনি ইন্তেকাল করলে আল্লামা নোমান ফয়জী সাহেব নিজ নানা মুফতীয়ে আজম রহ. ও পিতা আল্লামা মুজাফফর রহ. এর রেখে যাওয়া আমানত " মেখল মাদরাসার"  হাল ধরতে হাটহাজারী মাদরাসা থেকে সেচ্চায় বিদায় নিয়ে মেখল চলে যান। ২০০৫ ইং থেকে অদ্যাবধি  অত্যন্ত দক্ষতা ও বিচক্ষণতার সাথে  মেখল মাদরাসার মহাপরিচালকের গুরু দায়িত্ব পালন করে আসছেন আল্লামা নোমান ফয়জী দা বা.।

আমি মেখল মাদরাসার একজন প্রাক্তন ছাত্র। দীর্ঘ সাত বছর মেখলে পড়েছি। নোমান ফয়জী সাহেব হুজুরের নিকট মিজান কিতাব থেকে শুরু করে হেদায়া ১ ম খন্ড সহ বহু কিতাব আমি পড়েছি। তিনি আমার প্রাণপ্রিয় উস্তাদ। আজ ১০ বছর যাবত আমি হাটহাজারীতে আছি। আমার জানা ও দেখামতে আল্লামা নোমান ফয়জী সাহেব হুজুর বিতর্কের উর্ধ্বে একজন খাটি আল্লাহ ওয়ালা বুজুর্গ ব্যক্তি। নোমান ফয়জী সাহেব হুজুরের নামে  কোন সমালোচনা আজো শুনিনি।

আল্লামা নোমান ফয়জী সাহেব হাজার হাজার আলেমের কলিজার টুকরা উস্তাদ। সাড়া বাংলাদেশে তাঁর হাতে গড়া হাজার হাজার আলেম,মুফতী,মুহাদ্দিস,ইমাম-খতীব, লেখক ও গবেষক রয়েছে। তিনি অত্যন্ত নরম তবিয়তের একজন মানুষ। একজন বিদগ্ধ আলেম।সুমিষ্টভাষী ও জনপ্রিয় ওয়ায়েজ।

বাংলা ও উর্দূ ভাষায় অর্ধ শতাধিক কিতাবপত্র লিখেছেন তিনি। কওমী মাদরাসার পাঠ্যসূচির বহু কিতাবের ব্যখ্যাকার আল্লামা নোমান ফয়জী । সাবলীল উপস্থাপনা, মধুময় বাক্যশৈলী ও সর্ববোধগম্য দরস প্রদানে সকল ছাত্রদের প্রিয় উস্তাদ তিনি। তার মতো ক্লিন ইমেজের একজন বয়োবৃদ্ধ বুজুর্গ আলেম ব্যক্তিকে নিয়ে কটুক্তি করা চরম ধৃষ্টতার শামিল। মিথ্যাচারকারীদের কটুক্তিতে  আমরা যারপরনাই মর্মাহত। 

প্রশাসনের নিকট দাবী জানাই,
অনতিবিলম্বে Kamrul hasan নামে আইডি ব্যবহারকারীকে খোঁজে বের করে  তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। এবং কাদের ইন্দনে এ সব ফ্যাক আইডি থেকে এভাবে শীর্ষ ওলামায়ে কেরামের নামে কটুক্তি করা হচ্ছে তা অনুসন্ধান করে বের করার দাবী জানাচ্ছি 

আমি মেখলের একজন প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে আমার উস্তাদ আল্লামা নোমান ফয়জী সাহেব হুজুরের শানে কামরুল হাসানের কটুক্তির তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। এবং কটুক্তিকারীদেরকে হুশিয়ারী উচ্চারণ করে বলছি,
অনতিবিলম্বে যদি কটুক্তি বন্ধ করা না হয় মেখলের সন্তানরা তোমাদের কটুক্তির দাঁতভাঙা জবাব দেবে,ইনশাআল্লাহ।

লেখক: 
প্রাক্তন ছাত্র মেখল মাদরাসা
ক্ষাবর্ষ-২০০৯ -২০১৫ ইংরেজি ]



৫ মে রাতের ভয়াবহ নারকীয়  হামলার খবরে সারাদেশের মত হাটহাজারীবাসীও মর্মাহত। শোকে কাতর সবাই। রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা। রাস্তার মোড়ে মোড়ে পুলিশি পাহারা। সবার মাঝে আতংক আর উৎকণ্ঠা। বিভিন্ন জনকে নাজেহাল করার খবরও পাওয়া যাচ্ছে। নিরাপত্তা বলতে কোন কিছু আছে বল মনে হচ্ছিল না।

৫ মে শাপলার মোবারক মজমায় আমরা যারা শরীক হতে পারিনি তারা ৬ মে ক্লাসে বসে বিভিন্ন দুআ দরুদ পড়ছিলাম। সবার মাঝে চাপা ক্ষোভ। প্রতিশোধের আগুনে সবাই দগ্ধ হচ্ছে। সকাল থেকে আমাদের সাথেই ছিল শাহাদাত। বিভিন্ন আমলে শরীক হলো। অনেক সময় বসে বসে গল্প করলাম। রাতের নৃশংসতার কথা স্মরণ করে কেঁদে উঠেছিল। দুপুরের বিরতিতে বাড়িতে গিয়েছিল খাবার খেতে। পরিস্থিতি বিবচনায় আমরা নিষেধ করলাম। আজকের খবারে আমাদের দস্তরখানায় শরীক হওয়ার আমন্ত্রণ জানালাম। কিন্তু, শাহাদাতের পিয়ালা হাতে বেহেশতের হুর যখন আহবান জানায় তখন দুনিয়ার সকল কিছুই তুচ্ছ মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। কোন বাধা বা সম্পর্ক শাহাদাতকে ফিরাতে পারলো না। কিন্তু এটাই যে শেষ যাওয়া তাও জানা ছিল না। প্রতিদিনের মত দুপুরের খাবার খেয়ে মাদ্রাসার পথ ধরেছে "শাহাদত হোসেন"। 

হাটহাজারী বাসস্ট্যান্ডে  পৌঁছাতেই খবর পেলো আল্লামা শাহ আহমাদ শফীকে গ্রেফতার করেছে প্রশাসন। থমকে দাঁড়ায় শাহাদত। এমন দুঃসংবাদ কোনভাবেই মেনে নিতে পারে না। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে রাস্তার পাশে। কী করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না! এমন সময় দেখতে পায় হাজার-হাজার তৌহিদী জনতা প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে এসেছে। নারায়ে তাকবিরের ধ্বনিতে আকাশ-বাতাশ প্রকম্পিত করে তুলছে। 

শাহাদাত চৈতন্য ফিরে পেল। সারা শরীরে তারুণ্যের প্রবাহ বয়ে গেল। প্রতিশোধের দিপ্ত শপথ নিল। আল্লাহ, রাসূল ও দীনের ধারক-বাহক উলামায়ে কেরামের বিরুদ্ধাচারণকারীদের শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরবে না। প্রয়োজনে শহিদ হবে, তবুও পিছু হাটবে না। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। মুষ্টিবদ্ধ হাত। হৃদয়ে শাহাদাতের তামান্না। দু'চোখে জান্নাতের স্বপ্ন। যেন হুরদের হাতছানি আর দুই কানে ভেসে আসছে  গিলমানদের অভ্যর্থনা। মুখে নাস্তিকদের বিরুদ্ধে শ্লোগান। ছুটে গিয়ে শরীক হলো মোবারকময় মিছিলে। মিসে গেলো শহিদী তামান্নায় উজ্জবিত  হাজারো মানুষ ভিরে। মনের একটাই আশা, হয়তো শাহাদত, না হয় রাসূলের দুশমনের ফাঁসি। 

চলছে প্রতিবাদ মিছিল। মেখল থেকে হাটহাজারীর পথ খানিকটা দূর হওয়ায় আমরা যেতে একটু দেরি হয়ে যায়। আমি থানার সামনে আর মিছিলকারীরা হাটহাজারী মাদ্রাসার সামনে। পুলিশের এলোপাথাড়ি গুলিবর্ষণ। চোখের সামনে যেন কিয়ামতের বিভীষিকা। চারপাশ অন্ধকার। মুহূর্তে ভয়াল পরিস্থিতি। আমরা কয়েকজন কলেজ গেটের দিকে মোড় নিলাম কাচারি রোড হয়ে। মুখে শ্লোগান বুকে ঈমানী বল।

বর্তমান  আমির এরশাদ প্লাজার সামনে যেতে না যেতেই আমাদের উপর গুলিবর্ষণ আর টিয়ারশেল নিক্ষেপ শুরু হলো। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে নিজেকে মার্কেটের এক গলিতে আবিস্কার করি। এভাবেই ফিল্মি স্টাইলে নবীপ্রেমিক তৌহিদী জনতার আবেগ আর ভালোবাকে বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝড়া করে দেয়ার চেষ্টা করা হলো। ঝরে পড়লো ৬টি তরুতাজা প্রাণ। জীবনের তরে পঙ্গু হয়ে যায় বেশ কিছু রাসূল প্রেমিক। মুহুর্মুহু গুলির শব্দে ভারি হয়ে ওঠে ইলমের নগরী হাটহাজারীর আকাশ-বাতাশ। ডুকরে কেঁদে উঠে হাজারো পরিবার।

সেদিন শহীদ হয় প্রিয় বন্ধু শাহাদাত। সেই স্মৃতি আজো আমায় কাঁদায়। আজো বাতাসের সাথে ভেসে আসে টিয়ারশেল আর বারুদের গন্ধ। চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই হায়েনাদের পৈশাচিক উল্লাস। মুহুর্মুহু গুলির শব্দে এখনো কানে ভাসে। যখনই প্রিয় বন্ধুর গুলিবিদ্ধ শরীরটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে তখনই ডুকরে কেঁদে উঠি। অনুশোচনার আগুনে দগ্ধ হই। লজ্জায় দু'চোখ বেয়ে নেমে আসে অশ্রুর ধারা।

হে শহিদ বন্ধু, ক্ষমা করে দিয়ো! তোমার জন্য আমরা কিছু করতে পারিনি। বিচার চাওয়ার পরিবর্তে নিমকহারাম কিছু গাদ্দারকে আঁতাত করতে দেখেছি। শহীদদের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে বিক্রি হতে দেখছি মঞ্চ কাঁপানো অনেক মুনাফিককে। একটা আসন পাবার আশায় খুনিকে জননী ডাকতে দেখেছি। খুনির সামনে দাঁড়িয়ে বিচার চাওয়ার বিপরীতে  দাঁত কেলিয়ে মনোরঞ্জন করতে দেখছি প্রতিনিয়ত। এত এত হতাশার মাঝেও বিচারের আশায় আজ অপেক্ষায় করছি। কারণ,  আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘লা তাহযান’ হতাশ হয়ো না। আমি হাতাশ হইনি। আর মুমিন কখনো হতাশ হতে পারে না। দুআ করি আল্লাহ তোমাকেসহ সকল শহিদদের কবুল করুন।

লেখক: শিক্ষার্থী, হাটহাজারী মাদরাসা চট্টগ্রাম।

ইতিহাসের সেই ২০১৩ সাল। উত্তপ্ত রাজনীতির রোষানলে দাউ দাউ করে জ্বলছিল পুরো দেশ। দেশদ্রোহী রাজাকারের অভিযোগে একের পর এক ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলানো হচ্ছিলো জামা‌ত নেতা‌দের। বিরোধীদল বিএনপির জন্য আন্দোলনে নামা ছিল বড় দুষ্কর। সুযোগ মত পেলেই গ্রেফতার, এরপর রিমান্ড। ফলে তারা শক্ত‌িশালী হওয়া সত্ত্ব‌েও ‌ছিল নিষ্ক্রিয়। এদিকে রাজাকারদের ফাঁসির দাবিতে ঢাকার শাহবা‌গে গড়ে ওঠে গণজাগরণমঞ্চ। তাদের দেখা‌দে‌খি অপরাপর জেলাগুলোতেও গড়ে ওঠে গণজাগরণমঞ্চের শাখা। পুরো দেশ রাজাকারদের ফাঁসির দাবিতে প্রকম্পিত করে তুলেছিল তারা। প্রথম দিকে নিজস্ব গতিতে চললেও কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর তাদের দাবী ঘুরে গিয়ে ধর্মভি‌ত্তিক রাজনী‌তি নি‌ষি‌দ্ধের দাবীও যুক্ত হয়। একপর্যা‌য়ে তাদের অনেকেই ইসলাম ধর্মের অবমাননা শুরু করে এবং রাসূল সা. এর ব্যঙ্গ করতে থাকে। নারী-পুরু‌ষের এক‌ত্রে রা‌ত্রিযাপন ও অবাধ মেলা‌মেশায় গণজাগরণমঞ্চ একপর্যায় বেহায়াপনা ও বেলেল্লাপনার আখড়ায় পরিণত হয়।

তাদের এমন অবস্থা ও অবস্থান দেখে ঘরে বসে থাকতে পারেননি শায়খুল আরব ওয়াল আযম আল্লামা হোসাইন আহমদ মাদানী রহ. এর খাছ শাগরিদ, বাংলার সিংহপুরুষ, শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী হাফিযাহুল্লাহ। তিনি বাংলাদেশের শীর্ষ ওলামা-মাশায়েখ এবং ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের সাথে নিয়ে নবীর ইজ্জত রক্ষার্থে তথাকথিত গণজাগরণমঞ্চের বিরুদ্ধে এবং নাস্তিক ব্লগার‌দের সর্বোচ্চ শা‌স্তি ফাঁসির দাবিসহ মোট ১৩ দফা দাবি নিয়ে দেশের প্রতিটি জেলায় আন্দোলন গড়ে তোলেন। আন্দোলনের তীব্রতা এবং তাওহীদি জনতার গণজাগরণ দেখে সরকার হত‌বিহ্বল হ‌য়ে পড়‌ে। বাংলার জমিনে এমন আন্দোলনের দ্বিতীয় কোন নজির ছিল না। হেফাজতের অগ্রগ‌তি আটকা‌তে পা‌রে‌নি কেউ। কারণ এ আন্দোলন ছিল ঈমান, ইখলাস ও নবীপ্র‌ে‌মের। এরপরও আওয়ামী সরকার হেফাজ‌তের দাবী না মে‌নে উ‌ল্টো প্রশাসনিক সু‌বিধার মাধ্য‌মে শাহবাগী‌দের সা‌পোর্ট ‌দি‌তে থা‌কে এবং হেফাজতের বিরুদ্ধে তাদেকে খেপিয়ে তোলে।

এমন একটি মুহুর্তে সুযোগসন্ধানী হয়ে হেফাজত নেতাদের পিছু নেয় বিএনপি ও জামাত‌। সরাস‌রি টাইমলাই‌নে না এ‌সে বি‌ভিন্ন সু‌যোগ-সু‌বিধা দেয় হেফাজ‌তের সমা‌বে‌শে। এমন‌কি মুরুব্বীদের অগোচরে কিছু হেফাজত নেতাদের সাথে আতাঁত করতে সক্ষম হয়। ক্ষমতালোভী ও রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত কিছু আলেম তাদ‌ের দেয়া অফার ও সু‌যোগ সু‌বিধা গ্রহণ ক‌রে।

এভা‌বে চল‌তে চল‌তে একপর্যায়ে আন্দোলনের না‌স্তিক‌বিরোধী আন্দোলনের একটা অংশ সরকার পতন আন্দোলনে রূপ নেয়। হেফাজতের পুরো আন্দোলনটা ঘোলাটে করে নি‌জে‌দের ম‌তো ব্যবহার ক‌রে ক্ষমতালোভি সেই মহলটি।

বিশেষ করে ৫ মে ঢাকা অব‌রো‌ধে লক্ষ লক্ষ তৌহিদী জনতা ঢাকার রাজপথে বি‌ভিন্ন প‌য়েন্ট‌ে অবস্থান করছিল। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি ঘোষণা দেয় নেতা-কর্মীদের হেফাজতের পা‌শে দাঁড়া‌তে। তাঁর এই বক্তব্যে আওয়ামী সরকার আতঙ্কিত ও ন‌ড়েচ‌ড়ে বস‌লে হেফাজতকে সন্ধ্যার আগেই শাপলাচত্তর ত্যাগ করার নির্দেশ দেয়। এদিকে সরকারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাসূল সা. এর ইজ্জত রক্ষার্থে দাবি আদায়ের জন্য ময়দান ছাড়তে রাজি নয় হেফাজতের সরল মুখ‌লিস ওলামামাশায়েখ ও তাওহীদি জনতা। পরামর্শক্রমে এবং বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে রাত্রিযাপনের ঘোষণা দেয় হেফাজত নেতৃবৃন্দ।

অন্যদিকে হেফাজতের কিছু ক্ষমতালোভী নেতা বিএনপির সাথে আঁতাত করে গদি দখলের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে এবং আন্দোলনের মোড় ভিন্নভা‌বে নেয়ার অপচেষ্টা চালায় এবং তাওহী‌দি জনতাকে রাত্রিযাপনের ব্যাপা‌রে বোঝা‌তে সক্ষম হয় তারা। এ‌দি‌কে পরেরদিন রাত পেরোলেই ৬ মে ঢাকায় পল্টনে বিএনপির জনসভা। তাদের লক্ষ্য ছিল, রাত অতিবাহিত হলে হেফাজতের জনসমুদ্র‌ে সকলেই যোগদান করবে। দল ভারি করে সরকার পতনের শেষ ঘণ্টা বাজাবে তারা! কিন্তু আওয়ামী সরকার তা আঁচ কর‌তে পেরে। হা‌তে নেয় নতুন প্লান। আর ক্ষমতা‌লোভী দু'দলের খেলার গু‌টি হয় হেফাজ‌তের নিষ্পাপ-নিরাপরাধ কর্মীরা।

হেফাজত কর্মীদের উপর ৬ মে রাত দু'টায় ধর্মপ্রাণ তাওহিদী জনতার কেউ যখন তাহাজ্জুদে আর কেউ বিশ্র‌াম কর‌ছে ঠিক সে সময় বিদ্যুৎ সং‌যোগ বিচ্ছিন্ন ক‌রে তাওহিদী জনতা এবং আলেম-ওলামা পীর-মাশায়েখদের উপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ চলায় সম্মিলিত বাহিনী। নে‌মে আস‌ে তাঁদের উপর ভয়াবহ কেয়ামত। যৌথবা‌হিনী ও আওয়ামী সরকা‌রের পোষা কুকুরগুলো হাম‌লে প‌ড়ে তা‌দের উপর। ই‌তিহা‌সের বর্বরতম পাশবিক নির্যাতন করে রাতেই ঢাকা ত্যাগ করতে বাধ্য করে আওয়ামী সরকার।

যৌথবা‌হিনী রাতভর মুহুর্মুহু গু‌লি ও হামলা চা‌লি‌য়ে শতাধিক মুসল্লীকে শহীদ এবং হাজার হাজার আলেম-ওলামা ও তাওহিদী জনতাকে আহত ও পঙ্গু ক‌রে দেয়। এমন বর্বরো‌চিত হামলা স্বাধীনতার পর বাংলার জমিনে দ্বিতীয়বার সংঘটিত হয়নি। সে ক্ষত এখ‌নো আ‌ছে, থাক‌বে সারা জীবন!

এ অমানবিক হামলার দায় যেমনটি আওয়ামী সরকারের, ঠিক তেমনটি বিএনপি-জামাত জোটের। কিয়ামতের দিন উভয় ক্ষমতাধরকে আল্লাহর কাঠগড়ায়  দাঁড়াতে হবে। দাঁড়াতে হবে ঐ সমস্ত ক্ষমতালোভীদেরও যারা সেদিন হেফাজতের ভেতরেই ঘাপটি মেরে ছিল। সেইদিন আল্লাহ তাআলা এর উপযুক্ত বিচার করবেন ইনশাআল্লাহ।

৫ মে হামলার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত হেফাজত থেকে স্বার্থ হাসিলের অপচেষ্টা চালিয়েছে বিএনপি-জামাত। একথ‌া ব‌াস্তব‌ যে, সেদিন সরকার পতনের জন্য হেফাজতকে ব্যবহার করতে চেয়েছে বিএনপি। এদিকে আওয়ামী সরকার বিএনপির অবস্থান জেনে ক্ষমতার জন্য অমানবিক নির্যাতনের মাধ্যমে নির্দোষ নিরাপরাধ তাওহিদী জনতা এবং আলেম- ওলামাদের শাপলা চত্বর ছাড়তে বাধ্য করে।
যোগ বি‌য়োগ কর‌লে একথা প‌রিষ্কার, হেফাজতকে ক্ষমতার জন্য উভয় দল ব্যবহার করেছে। কেউ গদির পাওয়ার জন্য, কেউ গদি রক্ষার জন্য।

গতানুগতিক কথা বলছি না। এ বিষয়ে হেফাজতে শীর্ষ এক নেতার  ভিডিও সাক্ষাৎকার আমার কা‌ছেও আছে। সেখানে তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, ফরহাদ মজহারের উপস্থিতিতে বেগম জিয়ার সম্মতিক্রমে আমি এই হাতে ইসলামী রাষ্ট্রের রূপরেখা লিখেছি।
তিনি আরো বলেন, হাটহাজারী হযরতকে বলেছি, হুজুর কোন চিন্তা করবেন না, পরশু আপনি হবেন রাষ্ট্রপতি এবং বেগম জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী করে আমরা ইসলামী হুকুমত কায়েম করবো।
তিনি আরো বলেন, অপারেশন চলাকালীন অর্থাৎ ৫মে রাতে বারবার হুজুর আমাকে বলেন ‌‌'এখন কী করব?' আমি হুজুরকে বলেছি, আপনি চিন্তা করবেন না।
হেফাজত নেতা বলেন, হঠাৎ আমি শুনতে পাই হুজুর নাকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলে দুটি টিকিট সংগ্রহ করে চট্টগ্রাম চলে যাচ্ছে। এ কথা বলে দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, কেন হুজুর চলে গেলেন তিনি না গেলে কেউ কী তাঁকে জোর করে নিয়ে যেতে পারতো?
হুজুর যদি ওই রাতে না গিয়ে মিডিয়ার সামনে বলতো ভাইয়েরা, তোমরা যে যেখানে অবস্থান করছো তোমরা থাকো, ইনশাআল্লাহ  সকালে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। তাহলে পরের দিন আমরা ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করতে পারতাম।

সে হেফাজত নেতার কথায় সুস্পষ্ট বোঝা যায়, তারা তাওহিদী জনতার আস্থা, বিশ্বাস ও রক্তের সাথে গাদ্দারী করে নিজেদের বিক্রি করে দিয়েছিল। না হয় বেগম জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী করে ইসলামী রাষ্ট্র কায়েমের স্বপ্ন দেখে কী করে?

যুগে যুগে এভা‌বে ক্ষমতালোভী আলেমই নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ইসলামকে কুলষিত করেছে।  

আমরা দেখেছি
-ক্ষমতার জন্য কাউকে তারা রাবেয়া বসরী উপাধি দিতে দ্বিধা‌বোধ করে না।
-আবার বেগম জিয়াকে গদিতে বসিয়ে ইসলামী রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতেও তাদের বুক কাঁপে না।
-আবার কেউ কওমী জননী উপাধি দিতেও পরোয়া করে না।
-কেউ ক্ষমতা ও পদের লোভে গোমরাহী আকীদা পোষণকারীদের অনুসরণ-অনুকরণ করে।
-কখনো স্বার্থ হাসিলের জন্য কওমী মাদরাসার ইতিহাস-ঐতিহ্য ও স্বকীয়তা ভূলুণ্ঠিত করতেও তারা দ্বিধাবোধ করে না।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বিএনপি যদি সেদিন তাদের চক্রান্তে স্বার্থক হতো, হেফাজত‌কে সিঁ‌ড়ি হি‌সে‌বে ব্যবহার কর‌ে নতুন সরকার গঠন কর‌তো, তার পরও আলেম-ওলামাদের নেতৃত্ব প্রদান তো দূরের কথা বরং বি‌ভিন্ন মামলায় হেফাজতকে জেলে ভরে তারা একক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতো।

পরিশেষে, মহান আল্লাহর কাছে মিনতি করি, মুসলিম জাতিকে যেন আদর্শিকভাবে পদস্খলন না করেন। ঈমান এবং নীতি-নৈতিকতার উপর অটুট রাখেন।

লেখক: শিক্ষার্থী, দারুল উলুম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।



মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী ও তারেকুল ইসলাম: আজ ঐতিহাসিক ৫ মে। ২০১৩ সালের এই দিনে চট্টগ্রামের দারুল উলুম হাটহাজারী মাদরাসার মুহতামিম ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় আলেম শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বে ‘হেফাজতে ইসলাম’ নামক একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ইসলামবিদ্বেষী ও নবী সা:-এর অবমাননাকারী ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে গণ-আন্দোলন গড়ে তোলে। তারা দাবি আদায়ের জন্য শান্তিপূর্ণ ‘ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি’ পালন করে শাপলা চত্বরে জমায়েত হন। কিন্তু সরকার হেফাজতের মূল দাবি আমলে না নিয়ে সেদিন মধ্যরাতে ওই এলাকার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে অন্ধকারে কাপুরুষের মতো নিরস্ত্র লাখ মানুষের ওপর বর্বরোচিত অভিযান পরিচালনা করে। এই ক্র্যাকডাউনে অনেক নিরীহ আলেম-হাফেজ-মুফতি-মুহাদ্দিস-কারি ও ধর্মপ্রাণ মুসলমান শাহাদতবরণ করেন বলেই জনগণের বিশ্বাস।

যৌথবাহিনীর গুলিতে আহতের সংখ্যা ১০ হাজারেরও বেশি। এখনো আহত অনেকে বুকে ও শরীরে বুলেট বহন এবং অন্ধত্ব ও পঙ্গুত্ব বরণ করে যন্ত্রণাকাতর জীপন যাপন করছেন। সরকার কর্তৃক বহু লাশ গুম করার অভিযোগ উঠেছিল। পরে হামলা-মামলা ও পেশিশক্তির জোরে হেফাজতের নিরীহ নেতাকর্মীদের হয়রানি ও জেল-জুলুমের মাধ্যমে এবং নানা কৌশল ও হুমকি-ধমকি দিয়ে কোণঠাসা করার চেষ্টা করা হয়। এমনকি সরকারের নানামুখী চাপে শাপলা চত্বরে নিহতদের সঠিক সংখ্যা এবং তাদের সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ তথ্যাদি সংগ্রহের ক্ষেত্রেও হেফাজতকে চরমভাবে বাধা দেয়া হয়। নিবর্তনমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রের চরম দমনপীড়ন সত্ত্বেও হেফাজতে ইসলাম শানে রেসালাত সম্মেলন, ওয়াজ-মাহফিল, তাফসির মাহফিল ও সিরাতুন্নবী সা: সম্মেলনের মাধ্যমে দেশব্যাপী শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে। এসব কর্মসূচিতে বিপুল জনসমাগম লক্ষণীয় ।

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশে মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতা হরণ এবং ইসলামপন্থীদের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় উদাহরণ, শাপলা চত্বরে নিহতদের সংখ্যা প্রকাশ করার ‘অপরাধে’ অধিকার-এর সেক্রেটারি আদিলুর রহমান শুভ্রকে গ্রেফতার করা হয়। শাপলা চত্বরের গণহত্যার ব্যাপারে সরকার মূলত দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অন্ধকারে রাখতে চায়; কিন্তু ইনশাআল্লাহ সত্য এক দিন স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হবেই।

হেফাজতের মূল দাবির সত্যতা প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও মহান আল্লাহ পাক ও তাঁর রাসূল সা:-এর অবমাননাকারী, ইসলামবিদ্বেষী ব্লগারদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি সরকার আদৌ মেনে নেয়নি। গণ-আন্দোলনের মুখে কয়েকজন চিহ্নিত ব্লগারকে গ্রেফতারের নাটক সাজালেও তাদের শাস্তি না দিয়ে পরে সুযোগমতো জামিনে ছেড়ে দেয়া হয়। এর পরিণতিতে ‘সুবহানাল্লাহ’ নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, ধর্মদ্রোহী লতিফ সিদ্দিকী, ইসলামের সুদ তথা রিবা নিয়ে অপব্যাখ্যাদানকারী ও কওমি মাদরাসাবিরোধী অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুুহিত, পর্দাবিদ্বেষী সমাজকল্যাণমন্ত্রী মহসিন আলীরা খোদ রাষ্ট্রের কোটর থেকেই একে একে স্বরূপে বেরিয়ে এসেছেন। যদি সরকার হেফাজতের দাবি আমলে নিয়ে ইসলামবিদ্বেষী ব্লগারদের বিচার করত, তাহলে কোনো মন্ত্রী বা নেতা ইসলামি মূল্যবোধ ও তৌহিদি জনতার ঈমান-আকিদায় আঘাত করে কথা বলার সাহস পেতেন না।

হেফাজতে ইসলাম মুসলমানদের ঈমান-আকিদা রক্ষার লড়াইয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকে। ঈমান-আকিদার সঠিক চর্চা, সংরক্ষণ ও লালন করা না হলে মানবজীবন অভিশপ্ত ও নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। ঈমান-আকিদাই হচ্ছে মুসলিম জীবনের সামগ্রিক ব্যবস্থার মূলভিত্তি। শুধু কালেমায়ে শাহাদাত পড়ে মুসলিম নাম ও বেশ ধারণ করলেই ঈমান-আকিদার শর্তগুলো পূরণ হয় না। আল্লাহর একক অস্তিত্বের প্রতি নিরঙ্কুশ বিশ্বাস ও তাকওয়া এবং একইসাথে মানব জাতির জন্য আল্লাহ প্রেরিত নির্দেশনামূলক সামগ্রিক জীবনব্যবস্থা তথা কুরআন ও রাসূল পাক সা:-এর সুন্নাহ অনুসরণ করে জীবন যাপন করাই হলো ঈমান-আকিদা মোতাবেক চলা। এখান থেকে বিচ্যুত হলেই ইহজীবনে বিপর্যয় নেমে আসতে বাধ্য; কেননা ঈমান-আকিদার প্রতি উদাসীনতা এবং এর অনুপস্থিতি সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে বেইনসাফি ও জুলুম কায়েম হওয়ার পথ সুগম করে দেয়। ঈমান-আকিদা সার্বিক ন্যায় ও ইনসাফের কথা বলে। শুধু ভোগের মধ্যেই নয়, ত্যাগেও যে সুখ আছে সেটার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। ঈমান-আকিদা হচ্ছে মহান প্রভুর কাছে দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতার ব্যাপারে উন্মুখ থাকা। ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারিতা ও উন্নাসিকতা দমন করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে এটা। আধ্যাত্মিক সঞ্জীবনী ও অন্তরের আত্মশুদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে শত আইন-কানুনেও মানুষের সহজাত রিপুর তাড়না ও পঞ্চ ইন্দ্রিয় সংযত করা অসম্ভব। মুসলমানদের আধ্যাত্মিক চেতনা তথা তাকওয়ার ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টির মূল নিয়ামক হলো ঈমান-আকিদা। ইসলাম গ্রহণের বা মুসলমান হওয়ার মূল শর্তই হলো ঈমান-আকিদার সর্বব্যাপী চর্চা ও সংরক্ষণ করা। আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বে হেফাজতে ইসলাম ধর্মপ্রাণ জনতাকে সাথে নিয়ে সমকালীন ফিতনা এবং ভোগবাদী ও বস্তুবাদী অপশক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ঈমান-আকিদার চর্চা ও সংরক্ষণের লড়াই করে যাচ্ছে।

জনগণ যখন ঈমান-আকিদার ব্যাপারে উদাসীন বা অসচেতন হয়ে পড়ে, সেই সুযোগে রাষ্ট্রক্ষমতায় জালিম শাসকের অধিষ্ঠান সম্ভব হয়- এটা এক ধরনের খোদায়ী অভিশাপ। আল্লাহর জমিনে বাস করে এবং তাঁর অপার নেয়ামত ভোগ করে বান্দা কর্তৃক অবাধ্যতা ও বিরোধিতা কখনোই আল্লাহ তায়ালা বরদাশত করেন না। ঈমান-আকিদা চর্চার ফলে শাসক ও শাসিত উভয়ের মধ্যেই তাকওয়া বা আল্লাহভীতি সৃষ্টি হয়, ফলে জনগণ যখন ঈমান-আকিদার চর্চা করে, তখন তাকওয়ার কল্যাণে শাসকের পক্ষেও জুলুম-শোষণের পথে পা বাড়ানো সম্ভব হয় না। তাই ঈমান-আকিদার চর্চা এবং এর রক্ষণাবেক্ষণের কর্তব্যকে হেফাজত রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে অবশ্য পালনীয় মনে করে। বিপুল ত্যাগ স্বীকার এবং প্রাণদানের মাধ্যমে হেফাজতে ইসলাম ঈমান-আকিদা রক্ষার আপসহীন লড়াইয়ের পথ ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কায়েমি স্বার্থান্বেষী সব রাজনৈতিক শক্তির বিকল্প হিসেবে নিজের সম্ভাবনাকে ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

হেফাজতে ইসলাম ভুঁইফোঁড় কোনো সংগঠন নয়। হেফাজতের উত্থান এবং শাপলা চত্বরে অপরিমেয় ত্যাগ স্বীকারÑ ইতিহাস-বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনাও নয়; অধিকন্তু উপমহাদেশের ওলামায়ে কেরামের বিশাল এক সংগ্রামী ও আত্মদানের ইতিহাসের ধারাবাহিকতারই নব উপাখ্যান সৃষ্টি হয়েছে। স্বেচ্ছাচারী রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে মজলুম জনতার সঙ্ঘবদ্ধ সংগ্রামের প্রেরণা নিয়ে প্রতি বছর ঐতিহাসিক ৫ মে ফিরে আসে। এই প্রেরণা যুগে যুগে মানবিক ও নাগরিক মর্যাদা নিয়ে ঈমান-আকিদায় পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে বাঁচার তাগিদে সংগ্রামী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বারবার উজ্জীবিত করে তুলবে।

শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের রক্ত ও প্রাণ বিসর্জন বৃথা যাবে না ইনশাআল্লাহ। ইতিহাসের পর্যালোচনায় দেখা যায়, পলাশীর বিপর্যয়ের পর একের পর এক ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনগুলো, তথা ফরায়েজী আন্দোলন, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার ধ্বংস, বালাকোটের শাহাদতবরণ, রক্তাক্ত সিপাহি বিদ্রোহ কোনোটিই শেষ বিচারে ব্যর্থ হয়নি, বরং উপমহাদেশের ওলামায়ে কেরামের এই সুদীর্ঘ রক্ত, আত্মদান ও শাহাদতের পথ ধরেই ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির কবল থেকে ভারতকে স্বাধীন করা সম্ভব হয় এবং যথাক্রমে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সৃষ্টির পথ সুগম হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র তথা পাকিস্তান বানানো গেলেও সেটা ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি ইসলামি সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি। ঠিক তেমনই পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জুলুম-শোষণের নিগড় থেকে মুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে ৯ মাসের রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় হলেও এখানে মানবাধিকার, নাগরিক অধিকার ও ন্যায়-ইনসাফ নিশ্চিত করে একটি শোষণ-বঞ্চনাহীন সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার স্বপ্ন অপূর্ণ রয়ে গেছে। তবে হেফাজতের রক্ত ও প্রাণ বিসর্জনের বদৌলতে এ দেশে শোষক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নিপীড়িত সাব-অলটার্নরা ঈমানি শক্তিতে বলীয়ান হয়ে রুখে দাঁড়ানোর হিম্মত অর্জন করেছে।
বাংলাদেশে বিশুদ্ধ কুরআন-হাদিস ও ইসলামি জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হলো কওমি মাদরাসা; আর এই কওমি মাদরাসার আলেম ও ছাত্র-শিক্ষকরাই ন্যায়-ইনসাফ ও শান্তির পক্ষে এবং সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, দুর্নীতি, জুলুম ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কুরআন-হাদিসের বাণী প্রচার করে যাচ্ছেন। তারাই শাহ ওয়ালীউল্লাহর সংগ্রামী আদর্শ ও চেতনা ধারণ করে অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ-সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন।

১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবের পর উপমহাদেশে আলেম সমাজের ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র প্রতিরোধযুদ্ধ কিছুটা স্তিমিত হলেও তারা ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা-চেতনা, ইসলামি শিক্ষা, মূল্যবোধ ও দ্বীনি সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে মাদরাসা স্থাপনের কাজে ব্যাপৃত হন। হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা কাসেম নানতুবী (রহ:) ১৮৬৬ সালে ওলামায়ে কেরামের বহুল কাক্সিক্ষত প্রথম মাদরাসা বিশ্ববিখ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা করেন। উল্লেখ্য, মাওলানা কাসেম নানতুবী (রহ:) সিপাহি বিদ্রোহের সময় ঐতিহাসিক থানাভবন ফ্রন্টে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। পরে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। তিনি সুকৌশলে গ্রেফতার এড়িয়ে তার কার্যক্রম গোপনে অব্যাহত রাখেন। পর্যায়ক্রমে এই ধারার অজস্র মাদরাসা সমগ্র উপমহাদেশে গড়ে ওঠে। বাংলাদেশে এগুলো ‘কওমি মাদরাসা’ নামে পরিচিত। বিশেষত চট্টগ্রামের হাটহাজারী এলাকায় বাংলাদেশের বৃহত্তম কওমি মাদরাসা তথা দারুল উলুম হাটহাজারী মাদরাসা ১৮৯৬ সালে স্থাপিত হয়। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও সর্ববৃহৎ কওমি মাদরাসা। এই মাদরাসার বর্তমান মুহতামিম শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী (দা.বা.)। তিনি দেওবন্দ মাদরাসার সাবেক শায়খুল হাদিস, আওলাদে রাসূল সা: সাইয়েদ হোসাইন আহমদ মাদানীর একজন সুযোগ্য ছাত্র ও শিষ্য এবং আধ্যাত্মিক জগতে তার খেলাফত লাভ করেছেন।

শায়খুলহিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসানের ইন্তেকালের পর দেওবন্দ থেকে পরিচালিত ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম ত্যাগী যোদ্ধা ছিলেন সাইয়েদ হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ:)। অসহযোগ আন্দোলন থেকে শুরু করে ভারত স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত মাওলানা মাদানীর সংগ্রাম অব্যাহত থাকে। দখলদার ইংরেজ রাজশক্তি কর্তৃক ১৯২১ সালের ২৬ ডিসেম্বর করাচির খালেকদিনা হলে এক নিবর্তনমূলক মামলার শুনানিতে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মাওলানা মাদানী নির্ভীক চিত্তে বলেছিলেন : ‘‘ধর্মীয় উত্তেজনার ফলে ১৮৫৭ সালে ভারতে সর্বত্র যখন বিপ্লবের আগুন জ্বলে উঠেছিল, তখন রানী ভিক্টোরিয়া অর্থাৎ ইংরেজ সরকার ভারতীয়দেরকে যে প্রতিশ্রুতি ও ঘোষণা প্রচার করে তাদের সান্ত্বনা দিয়েছিলেন, তাতে উল্লেখ ছিল, ‘কারো ধর্মের ওপর কোনো হস্তক্ষেপ করা হবে না, বরং ধর্মীয় বিষয়ে দেশবাসীর পূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে।’ ব্রিটিশ পার্লামেন্টেও তা স্বীকৃত হয়েছিল। এমনকি পরবর্তীকালে সপ্তম অ্যাডওয়ার্ড এবং পঞ্চম জর্জও এ ঘোষণা সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান সরকার যদি রানী ভিক্টোরিয়া, পরবর্তী সম্রাট ও তাদের পার্লামেন্টের প্রতিশ্রুতি ও ঘোষণার কোনো মর্যাদা না দেন আর ভারতবাসীর ধর্মীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপকে সঙ্গত মনে করেন, তাহলে এ দেশের কোটি কোটি মুসলমানকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে যে, তারা মুসলমান হিসেবে বেঁচে থাকতে চায়, না নিরেট ইংরেজের বশংবদ প্রজা হিসেবে। ভারতের ৩৩ কোটি হিন্দুকেও অনুরূপ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মুসলমানদের তরফ থেকে ইংরেজ সরকারকে সতর্ক করে দিতে চাই, যদি সরকার ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ অব্যাহত রাখে, তাহলে মুসলমানেরা নিজের ধর্ম রক্ষার খাতিরে জীবন উৎসর্গ করে দিতেও কিছুমাত্র ইতস্তত করবে না। আর এ জন্য আমিই সর্বাগ্রে জীবন উৎসর্গ করতে এগিয়ে আসব’’ (সূত্র : আজাদি আন্দোলনে আলেম সমাজের সংগ্রামী ভূমিকা, জুলফিকার আহ্মদ কিস্মতি, পৃ: ৪৬-৪৭)। বাংলাদেশের বর্তমান আওয়ামী সরকার বিগত ২০০৮ সালের নির্বাচনে কুরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন পাস না করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর তারা আলেমসমাজ ও তৌহিদি জনতার বিশ্বাস ভঙ্গ করে একের পর এক কুরআন-সুন্নাহবিরোধী পদক্ষেপ নিয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতার নামে দেশকে ধর্মহীন করার উদ্দেশ্যে বিতর্কিত নারীনীতি ও শিক্ষানীতি প্রণয়ন, সংবিধানের মূলনীতি থেকে ‘মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ বাক্যটি বাদ দেয়া, জঙ্গিবাদের ধুয়া তুলে আলেম-ওলামা গ্রেফতার, জেল-জুলুম ও হয়রানি, কওমি মাদরাসা বন্ধের প্রয়াস ইত্যাদি সবই ছিল তৌহিদি জনতার ঈমান-আকিদার জন্য চরম হুমকি। দীর্ঘ দিন ধরে অনলাইন মাধ্যমে গোপনে চলে আসা ইসলামবিরোধী কার্যক্রম রুখতে এবং নবী সা: ও ইসলাম অবমাননাকারীদের বিচারের দাবিতে আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বে হেফাজতে ইসলাম রাজপথে গণ-আন্দোলনের সৃষ্টি করে। শাপলা চত্বরে শহীদদের রক্ত কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ছিল না। তাই এই পবিত্র রক্তধারা বৃথা যাবে না ইনশাআল্লাহ। আমিরে হেফাজত আল্লামা শাহ আহমদ শফী বলেছিলেন, ‘শাপলা চত্বরের গণহত্যার বিচারের ভার আল্লাহর ওপর দিয়ে দিলাম। নিশ্চয়ই তিনি মজলুমের সাথে আছেন। জালিমরা একদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। শাপলা চত্বরে শহীদদের রক্তের পথ বেয়েই এ দেশে একদিন ইসলামের বিজয় ঘটবে, ইনশাআল্লাহ।’ তিনি দলীয় নেতৃবৃন্দ ও তৌহিদি জনতাকে ধৈর্য ধারণ করতে বারবার আহ্বান জানিয়েছেন। উল্লেখ্য, হেফাজতের এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে জাস্টিস আল্লামা ত্বকী উসমানী, ড. ইউসুফ আল কারজাভি, ভারতের দেওবন্দের মুহাদ্দিস ও জমিয়ত সভাপতি আল্লামা সৈয়দ আরশাদ মাদানীসহ বিশ্ব ওলামা যৌথ বিবৃতি দিয়েছিলেন।

বর্তমান সরকারের মন্ত্রীরা ইদানীং অব্যাহতভাবে ইসলাম ও ইসলামি বিধিবিধানের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান করে যাচ্ছেন। ইসলামের ফরজ বিধান হজ নিয়ে কটূক্তি এবং রাসূল সা:-এর নামে চরম অবমাননামূলক মিথ্যাচার, ইসলামে নিষিদ্ধ ‘সুদ’ নিয়ে আপত্তিকর অপব্যাখ্যা, পর্দাবিদ্বেষী বক্তব্য, কওমি মাদরাসার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় কারসাজি ইত্যাদি বর্তমান সরকারের ইসলামবিদ্বেষী অবস্থানকে আরো জোরালো করে তুলেছে।
(লেখাটি ২০১৫ সালে লিখিত বিশেষ কলাম)

লেখক : সাংগঠনিক সম্পাদক, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ

| মাওলানা আশরাফ আলী নিজামপুরী 
বর্তমানে আমাদের দেশে তিন ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা চালু আছে। এক. শুধু জাগতিক শিক্ষা। দুই.  ধর্মীয় ও জাগতিক উভয়ের সমন্বিত শিক্ষা। তিন. শুধু ধর্মীয় শিক্ষা।  শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড বলে আমাদের সমাজে যে বচন চালু আছে তার বাস্তব চিত্রগুলো ফুটে ওঠে জাগতিক শিক্ষার কেন্দ্রগুলোতে। যদি আরো একটু ব্যাখ্যা করি তা হলো; শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড আর একটি রাষ্ট্রের  মেরুদণ্ড হচ্ছে অর্থ।  শিক্ষা ছাড়া জাতি যেমন মেরুদণ্ডহীন, তেমনি অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল রাষ্ট্রও মেরুদণ্ডহীন। একটি জাতি বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাইলে যেমন শিক্ষার প্রয়োজন, ঠিক তেমনি একটি রাষ্ট্রকে অন্য রাষ্ট্রের উপর প্রভাব বিস্তার করতে হলে অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল হওয়াটাও অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ।  মোটকথা জাতি ও রাষ্ট্র,  শিক্ষা এবং অর্থ একটি অপরটির সাথে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। একটি অন্যটি ছাড়া অচল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় হলেও ধ্রুব সত্য যে, বর্তমানে আমাদের দেশে শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক যে ধ্বস শুরু হয়েছে,  এর সাথে জড়িত সিংহভাগ জাগতিক শিক্ষায় শিক্ষিত। যারা শিক্ষিত হয়ে জাতির মেরুদণ্ড হবার পরিচয় দিচ্ছে তাঁরাই আবার রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড ভাঙ্গার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছে। দেশের কোটি কোটি টাকা রাতের আঁধারে লুটপাট করছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের  পরিসংখ্যানগুলো দেখলে বিষয়টা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, খুন-গুম, ধর্ষণ  চুরি-ডাকাতি, দুর্নীতি-চাদাবাজী, টেন্ডারবাজী ও কালোবাজারিসহ সকল অপরাধের মূলে অধিকাংশ  জাগতিক শিক্ষায় শিক্ষিতরা। এমনকি বহির্বিশ্বে স্বাধীন এই দেশটির সুনামও চরমভাবে ক্ষুণ্ন করছে তারাই! 

আর এর পুরো বিপরীতে রয়েছে কওমী মাদরাসা। সৎ, দক্ষ, আল্লাহভীরু ও সত্যিকারের দেশপ্রেমিক গড়ে তোলার এক অনন্য প্রতিষ্ঠান এই কওমী মাদরাসা। পদ্ধতিগতভাবে  ভারতের ঐতিহ্যবাহী দারুল উলুম দেওবন্দ কওমী মাদরাসার মূল মারকায বা কেন্দ্র হলেও শুরুটা হয়েছিল ১৪শ বছর আগে মসজিদে নববীর আঙিনায় মাদরাসা সুফ্ফা নামে। হযরত সাহাবায়ে কেরাম রা. ছিলেন সেই মাদরাসার ছাত্র আর আল্লাহর রাসুল সা. ছিলেন শিক্ষক। 

মাদরাসা সুফ্ফার নমুনায় সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের বলিষ্ঠ চেতনায় উজ্জীবিত ও দীনি চেতনায় উদ্দীপ্ত একদল আত্মত্যাগী সৎ-দক্ষ, কর্মঠ, খোদাভীরু দেশপ্রেমিক গড়ে তোলার মহান উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইশারায় হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা কাসেম নানুতুবী রহ. এর নেতৃত্বে যুগশ্রেষ্ঠ বুজুর্গানে দীনের হাতে ১৮৬৬ খৃষ্টাব্দের ৩০ মে ভারতের উত্তর প্রদেশস্থ সাহারানপুর জেলার দেওবন্দ নামক গ্রামে, ঐতিহাসিক সাত্তা মসজিদ প্রাঙ্গণে একটি   ডালিম গাছের নীচে, বর্তমান কওমী মাদরাসাগুলোর মূল কেন্দ্র বিশ্ববিখ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠিত হয়!

কওমী মাদরাসা প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই ঈমান আকিদা, ইসলামি তাহযিব-তামাদ্দুন, ইসলামের হেফাজত, প্রচার-প্রসার ও দেশের স্বাধীনতা  সার্বভৌমত্ব রক্ষাসহ অতীব জরুরি বাস্তবমুখী ও ফলপ্রসূ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে।  বিশেষ করে উপমহাদেশের রাজনৈতিক তৎপরতা,  উপনিবেশিক শক্তি ও পরাধীনতার জিঞ্জির ভাঙার লক্ষ্যে আযাদী আন্দোলনে অংশগ্রহণসহ মুসলিম উম্মাহর সামগ্রিক চিন্তা, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সঠিক  শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবেশ তৈরিসহ সর্বমহলে কওমী মাদরাসা ও  উলামাদের অবদান অপরিসীম। 

ভাষা আন্দোলনে কওমী উলামায়ে কেরামদের অবদান
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের মধ্যে  অন্যতম হলেন কওমী মাদরাসার সূর্যসন্তান  মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ। দারুল উলুম  দেওবন্দের কৃতীসন্তান মাওলানা তর্কবাগীশ ছিলেন ভাষা আন্দোলনের অগ্রনায়ক।  ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলার নিরীহ ছাত্রদের উপর যখন পাকিস্তানের হানাদারবাহিনী নির্বিচারে গুলি চালায় তখন সর্বপ্রথম পার্লামেন্টের অধিবেশন ত্যাগ করে রাস্তায় নেমে আসেন মাওলানা তর্কবাগীশ এবং মাওলানা তর্কবাগীশই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি সর্বপ্রথম  পাকিস্তানের গণপরিষদে বাংলায় বক্তৃতা করেন এবং বাংলাকে গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য করেন। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় তাঁর ত্যাগ অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে অনন্তকাল। (সূত্র: আলেম মুক্তিযোদ্ধার খোঁজে)

স্বাধীনতাযুদ্ধে কওমী মাদরাসা ও উলামায়ে কেরামের অবদান
১৯৭১ সাল। পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছেন এদেশের মুক্তিকামী সর্বশ্রেণীর মানুষ। যাদের অবদান অস্বীকার করার কোন অবকাশ নেই। দেশের মুক্তিকামী সৈনিকদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশ রক্ষায় দ্বিধাহীনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন এবং পিছিয়ে ছিলেন না এদেশের আলেম-ওলামা। নিজে যুদ্ধ করার পাশাপাশি উৎসাহিত করেছেন লাখো মানুষকেও। যাঁদের মাঝে উল্লেখ্যযোগ্য- মাওলানা আব্দুল হামীদ খান ভাসানী, মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ, মাওলানা আহমাদুল্লাহ আশরাফ, মাওলানা উবায়দুল্লা­হ বিন সাঈদ জালালবাদী, মাওলানা ওলীউর রহমান, মুহাদ্দিস আব্দুস সোবাহান, পটিয়ার শহীদ আল্লামা দানেশসহ অসংখ্য ওলামায়ে কেরাম। শুধু কি আলেমসমাজ? মহান মুক্তিযুদ্ধে এদেশের মাদরাসাসমূহ ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের একেকটি ক্যাম্প। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শহীদ  মেজর জিয়াউর রহমান পটিয়া মাদরাসায় অবস্থান নিয়েই চালু করেছিলেন কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র। আজও সেই অস্থায়ী বেতার কেন্দ্র ‘পটিয়া মাদরাসার মেহমানখানা’ ইতিহাসের বিরল সাক্ষী হয়ে আছে।

যশোর রেলস্টেশন মাদরাসা প্রাঙ্গণে ২১ শহীদের গণকবরও এটাই সাক্ষী দেয় মুক্তিযোদ্ধারা মাদরাসায় অবস্থান করতেন। বরিশালের চরমোনাই মাদরাসা ছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রাগার। ছিল তাদের আশ্রয় কেন্দ্র। এমন অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে যা এখানে বলে শেষ করা সম্ভব নয়।
অথচ, দুঃখের সাথে বলতে হয় আজ স্বাধীনতার ইতিহাস রচনা হয়েছে সেই মহান ব্যক্তিবর্গকে বাদ দিয়ে। সুকৌশলে বাদ দেয়া হয়েছে হযরত ওলায়ে কেরামকে। রাজাকার, আল বদর আর দেশদ্রোহীদের কাতারে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়েছে তাদেরকে। আক্রমণ করা হচ্ছে বিভিন্নভাবে। আঁকা হয়েছে/হচ্ছে বিভিন্ন কালিগ্রাফি। নির্মাণ করা হয়েছে, এখনো হচ্ছে অসংখ্য মুভি, নাটক ও কমেডি ভিডিও! ওলামায়ে কেরামকে উপস্থান করা হচ্ছে ব্যঙ্গাত্মকভাবে। যার মূলে রয়েছে স্বাধীনতা ও দেশবিরোধী শক্তি গভীর ষড়যন্ত্র। যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে আজও মেনে নিতে পারছে না।

আমাদের মনে রাখতে হবে, আলেম-ওলামা কখনো দেশবিরোধী ছিলেন না। এদেশ স্বাধীনের পেছনে যেমন আলেম-ওলামার প্রয়োজন হয়েছে, ঠিক দেশকে এগিয়ে নিতে হলেও আলেম-ওলামার প্রয়োজন আছে। আলেম-ওলামাকে এড়িয়ে দেশকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। 

শিক্ষাব্যবস্থায় কওমী মাদরাসার অবদান
যে যাই বলুন না কেন, আমাদের মতে বর্তমান সময়ে শিক্ষা ব্যবস্থা রক্ষা ও সুন্দরভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে কওমী মাদরাসার অবদান অপরিসীম। দুর্নীতি, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি, হল দখল, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে মিনি ক্যান্টনমেন্ট বা পতিতলায় তৈরি করাসহ শিক্ষার পরিবেশকে বিনষ্ট বা প্রশ্নবিদ্ধ করার যে প্রয়াস জাগতিক শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে চোখে পড়ে তা কওমী মাদরাসাগুলোতে কখনো কল্পনাও করা যায় না! মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা, সম্প্রীতি, সহানুভূতি, একে অপরের প্রতি কল্যাণকামীতা ও সর্বোপরি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টাই একমাত্র কওমী শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য।  
একশ্রেণির জ্ঞানপাপী বুদ্ধিজীবী রয়েছেন, যারা সময়ে-অসময়ে কওমী শিক্ষাব্যবস্থা ও কওমী ওলামাদের দিকে আঙ্গুল তুলে কওমী মাদরাসাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার হীন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে খুন-খারাবি, মাস্তানি, ধর্ষণ, গুম-হত্যা, দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ, হরতালের নামে ভাঙচুর ও উন্নয়নের নামে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা লুটপাট করা হয় তখন তাদের কলম বা মুখ কোনটাই চলে না। তারা তখন বধির ও বোবা হয়ে যায়। অথচ, কওমী ওলামাগণ যাঁরা সবসময় কুরআন-হাদিসের জ্ঞান চর্চায় লিপ্ত, প্রয়োজন ছাড়া কখনো বাইরেও যারা বের হন না, তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয় জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসীর তকমা। তাদের কেন এই অপতৎপরতা, এগুলো উদ্দেশ্য কী ভাবতে হবে দেশের সচেতন মহলকে।

নিরক্ষরতা দূরিকরণে কওমী ওলামায়ে কেরাম
আমাদের দেশে বিদ্যা এখন পণ্যের মত বিক্রি হয়। বিদ্যানের কোন কদর নেই। এখন বিদ্যার্জনের আগেই বিদ্যান হওয়ার প্রতিযোগিতা হয়। আর সেজন্য পরীক্ষার আগে প্রশ্ন ফাঁস এখন মামুলি ব্যাপার। আবার শোনা যায় সনদপত্র বিক্রির কথা। একজনের পরীক্ষা অন্যজন দিয়ে দেয়া বা অর্থের বিনিময়ে পরীক্ষায় পাশ করিয়ে দেয়া এখন নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার। তাই তো দেশের মেধাবীরা বুক ফুলিয়ে বলে 'আই অ্যাম জিপিএ ফাইভ। কারণ, তারা বিদ্যার্জনের আগেই বিদ্যান হওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিল আর অর্থের বিনিময়ে পেয়েছে জিপিএ ফাইভ। এ তো গেলো যাদের অর্থবিত্ত আছে তাদের কথা; অর্থের বিনিময়ে হলেও জিপিএ ফাইভটা পেয়েছে।  কিন্তু দরিদ্র্যতার কষাঘাতে জর্জরিত এই দেশের সিংহভাগ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করে। স্কুল-কলেজে যাওয়া তো দূরের কথা,  ঘরে বসে প্রাথমিক শিক্ষাটুকুও তাদের মেলে না। পরীক্ষায় অর্থের হাতবদলে জিপিএ ফাইভ পাওয়ার পর  যে বইগুলো ঠোঙার দোকানে বিক্রি করে, তখন দরিদ্রতার চাপ সহ্য করতে না পেরে দেশের হাজারো শিশু সেই বইগুলো দিয়ে ঠোঙা বানাতে ব্যস্ত থাকে। অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থী যখন স্কুলে যায়, তখন দেশের শতশত হতদরিদ্র পরিবারের সন্তানেরা রাস্তায় কাগজ কুড়ায়। অর্থের অভাবে যেন কোন শিশু জ্ঞানের আলো থেকে বঞ্চিত না হয় সেই দিকে লক্ষ্য রেখেই দেশের কওমী মাদরাসাগুলো শত-সহস্র  হতদরিদ্র পরিবারের সন্তানদের বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করছে। যা জাগতিক শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে বিরল। যে দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে সেটি কওমী মাদরাসা সুন্দরভাবে আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছে যুগ যুগ ধরে। দেশের হাজার হাজার নুরানী মাদরাসা থেকে প্রতি বছর প্রায় লক্ষাধিক কোমলমতি শিশু প্রাথমিক জ্ঞানার্জন করছে।

বেকারত্বরোধে কওমী উলামায়ে কেরাম
বেকারত্ব একটি অভিশপ্ত শব্দ। হাজারো মানুষের স্বপ্ন ভঙ্গের শব্দ বেকারত্ব। দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে বেকারত্বে সর্বোচ্চ হারের দিক দিয়ে বাংলাদেশ তৃতীয় অবস্থানে। তবে বাংলাদেশের চেয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ আফগানিস্তান ও দ্বীপদেশ মালদ্বীপে বেকার মানুষের হার বেশি।

আইএলওর হিসাবে ২০১০ সালে বাংলাদেশে ২০ লাখ লোক বেকার ছিল। ২০১২ সালে ছিল ২৪ লাখ। ২০১৬ সালে তা ২৮ লাখে উঠেছে। ২০১৯ সালে এ সংখ্যা ৩০ লাখে ওঠার আশঙ্কা করেছিল আইএলও। (প্রথম আলো অনলাইন সংস্করণ ২৪ জানুয়ারি ২০১৮)

বেকারত্ব সমস্যা সমাধানে সবাই সচেষ্ট হলেও আন্তরিকতার বড় অভাব। লাগামহীন দুর্নীতি,  চাঁদাবাজি,  চাকরির ক্ষেত্রে ঘুষের ছড়াছড়ি, নানান অনিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে আছে দেশের কর্মসংস্থানগুলো। যে দেশে জ্ঞানীর কদর নেই সে দেশে বেকারত্ব থাকাটা আশ্চর্যের কিছু নয়! এসএসসি ফেল ছাত্র যখন এসি রুমে বসে দুর্নীতির আখড়া খুলে বসে, ঠিক তখন বিসিএস ক্যাডার একটা চাকরির জন্য মানুষের দ্বারে ঘুরতে ঘুরতে জুতার তলা ক্ষয় করছে। একটা চাকরি জন্য মারামারি,  রাস্তা অবরোধ, বিভিন্ন কার্যালয়ে স্মারকলিপিসহ নানান প্রতিবাদমূলক কর্মসূচি চোখে পড়ে। সর্বশেষ কোটা সংস্কার আন্দোলন আমরা সবাই প্রত্যক্ষ করেছি।

কিন্তু এর পুরো বিপরীত চিত্র দেশের কওমী মাদরাসাগুলোতে। বেকারত্বের কোন ছাপ বা কোন অভিযোগ অনুযোগ নেই কওমী ওলামাদের।  চাকরির জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম বা মিছিল-মিটিংয়ের কোন প্রয়োজন হয়নি। প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা শেষ করে  প্রতিবছর কওমী মাদরাসা থেকে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী বের হয়। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোন শিক্ষার্থী চাকরির জন্য কারো কাছে কোন অভিযোগ বা অনুযোগ দেয়নি। কোন আন্দোলন-সংগ্রামেরও প্রয়োজন পড়েনি। এমনকি কোন কওমী শিক্ষার্থী বেকার বসে আছে এমন চিত্রও কোথাও দেখা যায় না। মোটকথা কওমী শিক্ষার্থীরা বেকারত্বের অভিশাপ থেকে নিজেদের বের করে নিজেরাই নিজেদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে নিয়েছে। সরকার বা কোন মন্ত্রণালয়ে চাপ সৃষ্টি,  রাস্তা অবরোধ কিংবা কোন সংগ্রামের প্রয়োজন পড়েনি।  

মোটকথা, বেকারত্বদূরীকরণসহ জাতীয় প্রায় সকল ক্ষেত্রেই কওমী মাদরাসার ভূমিকা অপরিসীম।

লেখক:
মুহাদ্দিস, হাটহাজারী মাদরাসা
কেন্দ্রীয়  সাহিত্য বিষয়ক সম্পাদক, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।

মাওলানা আশরাফ আলী নিজামপুরী

বছরে এক মাস রমজানের রোজা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি স্তম্ভের একটি। ইসলামি শরিয়তে সুবহে সাদেক থেকে সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত পানাহার এবং নফসের কুমন্ত্রণা ও প্রবৃত্তিবাসনা পূর্ণ করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকাকেই রোজা বলা হয়।

প্রত্যেক মুসলমান জ্ঞান, প্রাপ্তবয়স্ক, পুরুষ-নারী, যার রোজা রাখার মত শক্তি রয়েছে- তার উপর রোজা রাখা ফরজ। মান্নত, কাযা এবং কাফ্ফারার রোজাও ফরজ। এছাড়া বাকি সব রোজা নফল। যা রাখলে সাওয়াব পাওয়া যাবে, না রাখলে কোন গুনাহ হবে না। তবে মনে রাখতে হবে- রমজানের ঈদের দিন, কোরবানির ঈদের দিন এবং কোরবানির ঈদের পরের তিন দিন, সর্বমোট পাঁচ দিন রোজা রাখা হারাম।

সর্বাবস্থায় ঘরে বসে এই দোয়া বেশি বেশি করে পাঠ করি-
حسبنا الله ونعم الوكيل نعم المولا ونعم النصير
উচ্চারণ- “হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকিল, নি’মাল মাওলা ওয়া নি’মান নাসির”।
এ বছরের রোজা সারা পৃথিবীর মুসলমানরা অত্যন্ত স্পর্শকাতরভাবে আদায় করতে যাচ্ছে। কোভিড-১৯ বা করোনা নামক ভাইরাসে যখন সারা পৃথিবী আক্রান্ত, ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপদগ্রস্ত, ঠিক এমন সময় এসে গেলো পবিত্র মাহে রমজান।

এই রমজান মাসে রোজা অবস্থায় আমরা বেশি বেশি ইবাদত, তিলাওয়াত ও দান-সদকা করব এবং মহান আল্লাহর দিকে ফিরে আসার চেষ্টা করব। আল্লাহ তাআলা ছাড়া এই মহামারি থেকে কেউ আমাদেরকে রক্ষা করতে পারবে না।

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ঘরে পড়বো না মসজিদে পড়বো? জুমার নামাজ মসজিদে পড়বো না ঘরে জুমার স্থলে জোহরের নামায আদায় করবো? তারাবিহ মসজিদে পড়বো না ঘরে? ইফতার মসজিদে না ঘরে? এ সকল প্রশ্ন সিয়াম সাধনার এই মাসে পরিহার করে যার যেখানে সুযোগ হয় মসজিদে বা ঘরে এ সকল ইবাদত আদায় করার চেষ্টা করব।

এই মহামারি ও দুর্যোগপূর্ণ অবস্থায় ঘরে তারাবিহর নামাজ আদায় করলে নামাজ হবে না, জুমার দিনে জুমার নামাজের স্থলে জোহরের নামায ঘরে আদায় করে নিলে নামাজ আদায় হবে না, পাঁচ ওয়াক্ত নামায ঘরে আদায় করলে নামায আদায় হবে না; এমন ফতওয়া এই পর্যন্ত কেউ দেয়নি।

সুতরাং ‘মসজিদ খোলা থাকবে, নামাজ চলবে, জুমা চলবে, ইতিকাফ চলবে। সরকার নয় পৃথিবীর কোন শক্তি বাধা দিতে পারবে না।’ এ সকল দায়িত্বহীন উদ্দেশ্য প্রণোদিত, আবেগী ও রাজনৈতিক বক্তব্য পরিহার করতে হবে।

কারণ, বাংলাদেশ মুসলিম অধ্যুষিত দেশ, মসজিদ-মাদরাসার দেশ, ওলামা-মাশায়েখদের দেশ। মসজিদ বন্ধ করতে হবে, নামাজ চলবে না, জুমা চলবে না, ইতিকাফ চলতে পারে না, মসজিদে ইফতার করতে পারবে না- এধরণের কথাতো এই পর্যন্ত কেউ বলেননি। বলার সাহসও নেই।

তাই আসুন, স্বাস্থবিধি ও অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ মেনেই ইবাদত ও তিলাওয়াত জারি রাখি। তাতে পরিপূর্ণ সাওয়াবের আশা করা যায়। কাদা ছোঁড়াছুড়ি না করে তাওবা ও সিয়াম সাধনার মাধ্যমে  এই মাসে আমরা আল্লাহর দিকে ফিরে আসি। এই মাসেই দুর্দিন কেটে যাবে, ইনশাআল্লাহ।

অত্যন্ত পরিতাপের সঙ্গে বলতে হয়, কওমি মাদরাসার ডালভাত, নেমক খেয়ে, কওমি মাদরাসার পাঠাগার থেকে সাহিত্য শিখে কিছু কুলাঙ্গার কওমি মাদরাসারই শেকড় কাটার কাজে ব্যস্ত। আমি বলছি না যে, এই অঙ্গনের অসঙ্গতি নিয়ে আলোচনা করা যাবে না। দেখুন, আলোচনা আর শেকড় কাটা এক নয়, তা সবাই খুব সহজেই জানে।
লেখালিখি যখন শুরু করি, সেই ২০০২/২০০৩ সালের কথা। তখন হাসানুল কাদির নামের একজন লেখক সেলেব্রিটি ছিলেন এই অঙ্গনে। মজবুত ছিলো তার লেখার হাত। নবীন লেখকদের কিছুটা আইডল ছিলেন তিনি। অনেক নবীন স্বপ্ন দেখতো, তার মতো লেখক হবে। এই লেখক শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন বামপন্থী পত্র-পত্রিকায় ঘুরে ঘুরে তাদের টোপের শিকার হয়ে কওমি মাদরাসার শেকড় কাটতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।
তার পরিণতিটা আপনারা সবাই ভালো করেই জানেন। এখন সে পুরোপুরি উন্মাদ-পাগল। রাস্তায় পড়ে থাকেন। নর্দমার খাবার খান। শেকল দিয়ে তাকে বেঁধে রাখা হয়। আল্লাহপাক আমাদেরকে এমন অপদস্থ জীবন থেকে হেফাজত করুন, আমীন।
এ রকম ভ্রষ্টদের তালিকা অনেক। সেদিকে যাচ্ছি না। এবার আসি মূল কথায়।
করোনার মতো বৈশ্বিক মহামারীতে যখন বাংলাদেশও ক্রমশ ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে চললো, করোনায় আক্রান্ত মৃতদেহ ফেলে আদরের স্বজনরা পর্যন্ত ভয়ে পালিয়ে যায়, লাশ দাফন করার মতো কেউ এগিয়ে আসে না; দেশ ও জাতির এমন নাজুক সময়ে আল মারকাযুল ইসলামী নামের সংগঠনটির একদল নিবেদিতপ্রাণ আলেম এগিয়ে এলেন। কওমির এসব আলেম মৃত্যুভয় ভুলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করোনায় মৃতদের লাশ দাফন-কাফনে এগিয়ে এলেন।
তাদের এই মহানুভবতার কাজগুলো প্রায় প্রত্যেকটি জাতীয়মানের টিভি চ্যানেলে ফলাও করে প্রচারিত হতে লাগলো। রিপোর্টারদের ভাষ্যমতে, এইসব আলেমের কাজ দেখে এটাই প্রমাণিত হচ্ছে, পৃথিবী থেকে এখনো মানবতা নামক শব্দটির বিদায় হয়নি...।
এমন এক সময়ে ‘বাংলা ট্রিবিউন’ নামের জনপ্রিয় অনলাইন পোর্টালে বন্ধুবর সালমান তারেক শাকিল আল মারকাযুল ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মুফতি শহীদুল ইসলাম সাহেবকে ‘হুজিনেতা’ ট্যাগ লাগিয়ে কাকে/কাদেরকে খুশি করতে চাইছে বুঝলাম না। বুঝলাম না বললে ভুল হবে, হাসানুল কাদির যেই ভ্রষ্টপথে হাঁটছিলো, সালমান তারেকেও সেই পথে হাঁটছে। এবং বামপন্থী দাদাবাবুদের খুশি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। যারা ইসলাম ও ইসলামপন্থীদের কোনো উন্নতি দেখলেই এলার্জিতে ভোগে।
ওর সঙ্গে রাত জেগে দেয়ালিকা লিখতাম, তখন দেয়ালিকার সম্পাদক ছিলাম আমি। গল্প করতাম। মাদরাসার সব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আমরা একসঙ্গে কাজ করতাম। সেই দলের অনেক বন্ধুই এখন বিভিন্ন জায়গায় প্রতিষ্ঠিত। তবে কখনোই ভাবিনি, সালমান তারেক এতোটা বিগড়ে যাবে।
ভাবিনি, তবে কিছুটা আঁচ করেছিলাম। সে সময়কার জনপ্রিয় একটা সাপ্তাহিক ছিলো ‘এখন’ নামে। সেই পত্রিকায় সব আলেমদের জড়িয়ে ছড়া লিখলো সালমান। ছড়াটি সম্পাদকীয় পাতায় ছেপে অনন্য মূল্যায়ন করেছিলেন ওই পত্রিকার সম্পাদক। এবং সালমানের ওই আলেমবিরোধী ছড়ার জন্য প্রশংসা করে সম্পাদক সাহেব কলামও লিখেছিলেন।
এরই জেরে আরজাবাদ মাদরাসার কিছু ছাত্র ওকে ‘সাইজ’ করতে আমাদের মাদরাসায় চলে এলো। তখনকার প্রিন্সিপাল মাওলানা ইমরান মাযহারী সাহেব তখন সামলে নিলেন এবং সালমানকে ডেকে আমাদের সামনে তওবা পড়ালেন, যেন আর কখনোই এরকম ভ্রষ্ট লেখালিখি না করে।
সালমান কিছুদিন পর জনপ্রিয় দৈনিক আমাদের সময়ের সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টারের দায়িত্ব পায়। সেখানে গিয়েও কম করেনি। হেফাজত নিয়ে অনেক মনগড়া তথ্য প্রকাশ করেছে। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন।
প্রিয় বন্ধু! তোমার মতো কিংবা তোমার চেয়েও অনেক বড় সেলেব্রিটি সময়ের স্রোতে হারিয়ে যায়। বামঘরানার সাময়িক বাহবা পাওয়ার জন্য তোমার এতো বড় পদস্খলন মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। এখনো সূর্য ডুবে যায়নি, ফিরে এসো নীড়ে। কওমি মাদরাসা বা ইসলামের বিরুদ্ধে কলম ধরে তুমি টিকবে না, হাজারবার সত্য। বরং সময়ের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। হাসানুল কাদির আমাদের জন্য বড় শিক্ষা।
তুমি তোমার কলমের গতি পাল্টাও। আমরা তোমাকে বরণ করে নেবো সময়ের নদভী, আবু তাহের মিসবাহ, যায়নুল আবিদীনের মতো। সময় ফুরিয়ে যায়নি।
লেখক: আবৃত্তিকার ও উপস্থাপক, কলরব

Contact Form

Name

Email *

Message *

Powered by Blogger.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget