ফাইল ছবি

১৪৬৯ খ্রিস্টাব্দে আরাগনের ফার্ডিন্যান্ড ও কেস্টাইলের ইসাবেলার মধ্যে বিয়ে হয় এবং উভয় রাজ্য চিরতরে এক হয়ে যায়। এই মিলন মুসলিম স্পেনের ধ্বংসের পথ অবারিত করে দেয়। এই ক্রমবর্ধমান বিপদের সম্মুখীন হওয়া নাসরিদ বংশের সাধ্যাতীত ছিল। এ বংশের শেষ সুলতান এক রক্তক্ষয়ী আত্মকলহে লিপ্ত হন এবং তার অবস্থা আরো বিপদজনক হয়ে পড়ে। ১২৩২ হতে ১৪৯২ পর্যন্ত যে ২১ জন সুলতান রাজত্ব করেন, তাদের মধ্যে ৬ জন দুইবার এবং একজন তিনবার রাজত্ব করেন।
যে সময় আমেরিকার ইতিহাসের সূচনা, ঠিক সেই ১৪৯২ সালে এক দীর্ঘ অবরোধের পর খ্রিস্টান সৈন্যদের হাতে (মুসলিম) গ্রানাডার পতন ঘটে-‘ক্রুশ হেলালকে উৎখাত করে’। ‘উদার’ সম্রাট ফার্ডিন্যান্ড  ও সম্রাজ্ঞী ও ইসাবেলা মুসলমানদের আত্মসমর্পণের শর্তগুলো পালন করলেন না। ১৪৯৯ সালে রানী ইসাবেলার ধর্মগুরু কার্ডিনাল জিমেনেজ ডি সিসনারো’র নেতৃত্বে জোর করে ধর্মান্তর গ্রহণের অভিযান শুরু হয়। কার্ডিনাল প্রথম চেষ্টা করেন ইসলাম বিষয়ক সমস্ত আরবি বই পুড়িয়ে ফেলতে। গ্রানাডায় আরবী পাণ্ডলিপি পোড়ানোর উৎসব শুরু হয়। এরপর প্রতিষ্ঠিত হয় বিধর্মী উচ্ছেদ (মুসলিম উচ্ছেদ) আদালত- ইনকুইজিশন! এর কাজ জোরেশোরে চলতে থাকে।
গ্রানাডার পতনের পর যেসব মুসলমান রয়ে যায়, তাদের সবাইকে এখন থেকে বলা হয়, মরিসকো। স্পেনীয় ভাষায় এর মানে ছোট মুর। রোমকরা পশ্চিম আফ্রিকাকে বলতো-মরেটানিয়া। আর পশ্চিম আফ্রিকার বাসিন্দাদের বলতো, ম-রী। এই ম-রী হতে স্পেনীয় মোরো এবং ইংরেজি মুর শব্দের উৎপত্তি। বারবাররাই ছিল প্রকৃত মুর। কিন্তু স্পেন ও উত্তর পশ্চিম আফ্রিকার সমস্ত মুসলমানকেই মুর বলা হয়। ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জে পাঁচ লাখ মুসলমান আছে, এদের বলা হয় মোরো। ম্যাগেলান কর্তৃক ১৫২১ সালে এই দ্বীপপুঞ্জ আবিষ্কৃত হওয়ার পর স্প্যানীয়রা তথাকার মুসলমানদের এ নাম দেয়।
মুসলিম স্পেনীয়রা একটি রোমান উপভাষায় কথা বলতো। কিন্তু ব্যবহার করত আরবি হরফ। বেশিরভাগের না হলেও অনেক মরিসকোরই পূর্বপুরুষ স্পেনীয় ছিল। কিন্তু এখন সবাইকে ‘মনে করিয়ে দেওয়া’ হয় যে, তাদের পূর্বপুরুষরা খ্রিস্টান ছিল; কাজেই তাদের হয় আবার খ্রিস্টান হতে হবে, নইলে তার ফল ভোগ করতে হবে। মুদেজারদের মরিসকোদের সঙ্গে এক শ্রেণী ভুক্ত করা হয়। এদের অনেকে প্রকাশ্যে খ্রিস্টধর্ম স্বীকার করতো, কিন্তু গোপনে ইসলামের আচার-অনুষ্ঠান পালন করতো। কেউ কেউ খৃষ্টানি মতে বিয়ে করে বাড়ি এসে গোপনে ইসলামী মতে ফের বিয়ে করতো। অনেকে বাইরে খ্রিস্টানি নাম রাখতো, আর বাড়িতে ব্যবহারের জন্য আরবি নাম রাখতো।
১৫০১ সালে কেস্টাইলে এক রাজকীয় আদেশে ঘোষণা করা হয় যে, কেস্টাইল আর লিয়নের সব মুসলমানকে হয় খ্রিস্টান হতে হবে, না হয় স্পেন ছেড়ে চলে যেতে হবে। তবে মনে হয়, এই ঘোষণা অনুযায়ী যথাযথ কাজ হয়নি।
১৫২৬ সালে আরাগনের মুসলমানদের ওপর ওই একই আদেশ জারি করা হয়। ১৫৫৬ সালে দ্বিতীয় ফিলিপ এক আইন জারি করেন যে, বাকি মুসলমানদের অনতিবিলম্বে তাদের ভাষা, নামাজ-রোজা, অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং জীবনযাত্রা প্রণালী ত্যাগ করতে হবে। তিনি এমন আদেশ দিয়ে বসেন যে, স্পেনীয় হাম্মামখানাগুলিও বিধর্মীদের চিহ্ন, কাজেই সেগুলি ভেঙ্গে ফেলতে হবে। এতে গ্রানাডা অঞ্চলে বিদ্রোহ দেখা দেয় (এই দ্বিতীয় বার) এবং পার্শ্ববর্তী পার্বত্য অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। তবে সে বিদ্রোহ দমন করা হয়।
১৬০৯ সালে তৃতীয় ফিলিপ মুসলিম বিতাড়নের শেষ হুকুম নামায় দস্তখত করেন। এর ফলে স্পেনের সমস্ত মুসলমানকে জোর করে বের করে দেওয়া হয়। কথিত আছে, প্রায় পাঁচ লাখ মুসলমান আফ্রিকা বা অন্য কোনো মুসলিম দেশে যাওয়ার জন্য জাহাজে উঠতে বাধ্য হয়। হিসাবে দেখা যায় যে, গ্রানাডার পতন ও সপ্তদশ শতাব্দী প্রথম দশকের মধ্যে প্রায় ৩০ লাখ মুসলমান হয় নির্বাসিত, না হয় নিহত হন।
( ফিলিপ কে হিট্টি লিখিত ও অধ্যক্ষ ইব্রাহিম খাঁ অনূদিত ‘আরব জাতির ইতিকথা’ থেকে)