Articles by "শিল্প-সাহিত্য"

প্রবচনের বিশেষ সংখ্যার 
মোড়ক উন্মোচন করলেন আল্লামা আহমদ শফী
সাহিত্য সাময়িকী 'প্রবচন' এর বিশেষ আয়োজন ‘আল্লামা আহমদ শফী সংখ্যা'র মোড়ক উন্মোচন করেছেন শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী।
আজ ১৪ জুন শুক্রবার দুপুর ১২ টায় আমিরে হেফাজতের কার্যালয়ে প্রবচন মিডিয়া প্রকাশিত বিশেষ সংখ্যাটির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হয়েছে।
অনুষ্ঠানে আল্লামা আহমদ শফী তরুণদের বলেন, তোমরা বেশি বেশি লেখো। তোমাদের লেখালেখির পরিধি যত বাড়বে আমাদের বিষয়গুলো সাধারণ মানুষ ততটাই সঠিকভাবে জানতে পারবে। আশা করি প্রবচনের মাধ্যমে এ লাইনে অনেক কাজ হবে। তোমরা মিডিয়ার সাথে সম্পৃক্ত হও। মিডিয়াতে কাজ কর। সাংবাদিকতার নামে হলুদ সাংবাদিকতার মোকাবিলা কর। কলম দিয়ে এখন অনেক সন্ত্রাসী হয়। এগুলার বিরুদ্ধে তোমাদেরকে রুখে দাঁড়াতে হবে।।
এসময় তিনি প্রবচনের কৃতজ্ঞতা আদায় এবং প্রবচন মিডিয়ার সার্বিক অগ্রগতি কামনা করেন। পাশাপাশি সামনেও এরকম বিষয় নিয়ে কাজ করার জন্য উপস্থতি তরুণদের উদ্দেশ্যে বিশেষ পরামর্শ প্রদান করেন।
হাটহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীকে নিয়ে সাহিত্য সাময়িকী প্রবচনের বিশেষ আয়োজন 'আল্লামা আহমদ শফী সংখ্যা'। এ সংখ্যায় হুজুরকে ঘিরে বিশিষ্টজনদের, বিশেষ করে তরুণদের আবেগ-অনুভূতি ও মতামতগুলো স্থান পেয়েছে।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মাঝে উপস্থিত ছিলেন প্রবচন সম্পাদক কাজী হামদুল্লাহ, সহকারী সম্পাদক মুহাম্মাদ এমদাদুল্লাহ, ফাহিম আহমাদ, মাও. শফিউল আলম, মাও, ইবরাহিম খলিল সিকদার, ইনসাফ টুয়েন্টিফোর ডটকমের হাটহাজারী প্রতিনিধি জুনাইদ আহমদ, রাশিদুল ইসলাম,একুশে জার্নাল হাটহাজারী প্রতিনিধি হাবীব আনওয়ার, ইউসুফ বিন মাসুম ও আহনাফ আবদুল্লাহ প্রমুখ।
(পত্রিকা সংগ্রহ করতে যোগাযোগ : 01910296951 /৪৮পৃষ্ঠা ১২টাকা)








সালাহুদ্দীন জাহাঙ্গির
রমজান-রামাদান বিতর্কের একটা দীর্ঘমেয়াদী প্রতিফল আছে। সালাফি ঘরানার যারা এই প্রবণতায় আক্রান্ত, তারা আরবির প্রতি আকর্ষিত হয়ে এমন শুদ্ধ আরবির অনুশীলন-ব্যবহার শুরু করেছেন। কিন্তু বাংলা ভাষায় যখন আরেকটি ভাষার কোনো শব্দ অনুপ্রবেশ করে, স্বাভাবিকভাবেই সেটা বাংলাভাষার গতি-প্রকৃতি অনুসরণ করে নিজস্ব একটা রূপ দাঁড় করায়। এটা প্রত্যেক ভাষার নিজস্বতা। যেমন ইংরেজি Table (ট্যাবল) কে আমরা বলি টেবিল।
বহু শতাব্দী ধরে আরবিতে অনেক হিব্রু, ফার্সি, স্প্যানিশ শব্দ অনুপ্রবেশ করেছে। সেসবও কিন্তু আরবির গতি-প্রকৃতি অনুসরণ করে নিজস্ব ধরনে উচ্চারিত হয়ে আসছে। সেখানে মূল হিব্রু বা ল্যাটিনের স্বত্তাগত শব্দটি হুবহু উচ্চারিত না হয়ে আরবির প্রকৃতি অনুযায়ী নতুন গঠন ও উচ্চারণ তৈরি হয়েছে। যেমন স্প্যানিশ Constantinople (কনস্ট্যান্টিনোপল) আরবিতে অনুপ্রবেশ করেছে 'কস্তুনতুনিয়া' হয়ে। এটাই ভাষার সহজাত প্রক্রিয়া এবং ভাষা জন্ম নেবার পর থেকেই এ প্রক্রিয়া পৃথিবীর সর্বত্র শত শত শতাব্দী ধরে ঘটে আসছে। ভাষা প্রক্রিয়াজাতকরণের এই প্রক্রিয়া রোধ করার চেষ্টা করলে যেকোনো ভাষা তার নিজস্বতা হারাবে এবং ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হবে।
বাংলাভাষায় ব্যবহৃত আরবি বা বিদেশি শব্দকে যদি আপনি বাংলার নিজস্ব প্রক্রিয়ায় প্রক্রিয়াজাত হতে বাধা প্রদান করেন—এর ফলাফল হবে দু ধরনের।
এক. বাংলাভাষার নিজস্বতা নষ্ট হয়ে ভাষাটা ধীরে ধীরে দেউলিয়া হতে পারে, তখন আপনার অবস্থা হবে না ঘর কা, না ঘাট কা। আপনাকে কথা বলতে হবে যাযাবর সম্প্রদায়ের মতো মিশ্র ভাষায়।
দুই. সাধারণ বাংলাভাষী মানুষের মনে ধর্মীয় কুলীন ভাষা ব্যবহারে প্রবল ভীতি তৈরি হবে। কেননা সমাজের ৯৫% মানুষ আরবি মাখরাজ জানে না। তারা মনে করবে, আরবি মানেই যেহেতু ধর্মীয় ভাষা, সুতরাং সঠিকভাবে উচ্চারণ না করলে গোনাহ হবে। এ কারণে তাদের ভেতর খুব স্বাভাবিকভাবেই আরবি-ভীতি প্রবল হবে এবং 'তারাউইহ' 'স্বহীহ্' বা 'নাদাউই'র মতো মাখরাজধর্মী শব্দ উচ্চারণের প্রতি তাদের মনে অনীহা সৃষ্টি হবে। সম্ভবত এই ভীতি ইতোমধ্যেই জোরেশোরে শুরু হয়েছে। অনেকেই আরবিভাষা নিয়ে এমন গোঁড়ামি দেখে আরবি উচ্চারণে ইস্তফা দেয়া শুরু করেছে।
এখন একটা সম্পূরক কথা বলি। বাংলাদেশে ইসলাম আগমনের পর থেকে এ পর্যন্ত আরবি ভাষায় রচিত দশটি কিতাবের নাম বলুন তো! যেগুলো বাংলাদেশি কোনো স্কলার বাংলাদেশে থেকে আরবি ভাষায় রচনা করেছেন! দশটা আরবি কিতাবের নাম খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে নিঃসন্দেহে।
বিগত ১৩-১৪ শ বছরে এই দেশে আরব, পারস্য, হিন্দুস্তান থেকে শত সহস্র মুসলিম মনীষীর আগমন ঘটেছে। এই দেশে জন্ম নিয়ে প্রথিতযশা আলেম হয়েছেন—ইতিহাসে এমন ব্যক্তির উদাহরণও কম নয়। তারা 'স্বহীহ' আরবিতে কোনো গ্রন্থ রচনা করেননি বা 'স্বহীহ' আরবিতে কথা বলেননি বলে এ দেশ থেকে ইসলাম হারিয়ে যায়নি। বরং বিভিন্ন মুসলিম দেশ থেকে যারাই দাওয়াতের ব্রত নিয়ে এ দেশে এসেছেন, তারা কাল পরিক্রমায় এ দেশের মানুষের ভাষায় কথা বলেছেন। তাদের নিয়ে রচিত হয়েছে বড়জোর ফার্সি বয়েত, কিন্তু অঢেল লেখা হয়েছে বাংলা পুঁথি।
বঙ্গদেশে আগত বিখ্যাত প্রত্যেকজন মুসলিম সাধককে নিয়ে বাংলায় রচিত হয়েছে পুঁথিসাহিত্য। তাতে বাংলাদেশ থেকে ইসলাম বিদায় নিয়ে ইয়েমেন চলে যায়নি। বরং তারাই এসে বাংলার মাটি-বাতাস, জল-প্রকৃতির সঙ্গে নিজেদের একীভূত করে নিয়েছেন।
এ কারণেই বাংলাদেশের ইসলাম আর্মেনিয়া বা স্পেনের মতো নয়। স্পেনের ইসলাম ছিল শাসকগোষ্ঠীর ধর্ম। গ্রানাডা, কর্ডোভা, মালাগা, টলেডোর সাধারণ মানুষের মাঝে ইসলামকে তারা সার্বজনীন করতে পারেনি। সেখানে উমাইয়া প্রভাবিত শাসকদের প্রশাসনিক এবং দাপ্তরিক ভাষা ছিল আরবি। স্থানীয় স্প্যানিশ জনগণ ও ভাষার সঙ্গে শাসক ও ধনিক আরবীয় বংশোদ্ভূতরা একীভূত হতে পারেনি। ফলে ফার্ডিন্যান্ড ও ঈসাবেলার হাত ধরে স্প্যানিশ খ্রিষ্টীয় জাতীয়তাবাদের ধাক্কা যখন এসেছে, ইসলাম সেখান থেকে সমূলে উপড়ে চলে এসেছে।
একই কথা আর্মেনিয়া, আজারবাইজানের ক্ষেত্রেও।
আজকে যারা বাংলাভাষায় আরবি আধিপত্যবিস্তারের এমন প্রয়াস চালাচ্ছেন, তারা হয়তো বুঝতেও পারছেন না কী ক্ষতি তারা করে চলেছেন। তারা অতি ধার্মিকতার নামে বোকার মতো বাংলাভাষা থেকে ইসলামকে ক্রমশই দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন। ক্রমশই বাংলাভাষা এবং ইসলামের মধ্যে তৈরি করছেন দুর্লঙ্ঘ প্রাচীর। একদিন দেখবেন, আপনি নিজেই আর এ প্রাচীর ভেদ করতে পারবেন না।

আতাউর রহমান আল হাদী
.
রমজান আসে বছর ঘুরে
গুনাহ মাফের জন্য
মন খুলে যে পালন করে
হয় সে পরম ধন্য।

তিরিশ রোজা রাখবে যে জন
রমজানের এই মাসে
রোজ হাশরে পাইবে ছায়া
আল্লা'র আরশ পাশে।

আল্লাহ-ভীতি আসবে মনে
ছাড়লে খারাবি
সকল গুনাহ মুছে যাবে
পড়লে তারাবি।


প্রবচনের প্রকাশিত দ্বিতীয় বই 'সাবীলুত তাযকিয়া' আমাদের হাতে চলে এসেছে। শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী হাফিযাহুল্লাহর নির্দেশনায় বইটি লিখেছেন তাঁর অন্যতম খলিফা 'মাওলানা আহমাদ মোস্তফা'। আর প্রকাশ করেছে প্রবচন মিডিয়া পরিচালিত 'প্রবচন প্রকাশনী'।
পবিত্র মাহে রমযান আত্মশুদ্ধির মাস। মানুষ কিভাবে সঠিক পদ্ধতিতে আত্মশুদ্ধি করতে পারে, কুরআন-হাদিস ও মুজতাহিদ উলামায়ে উম্মতের কাছে আত্মশুদ্ধির অবস্থান এবং তাসাউফ ও পীর-মুরিদীসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেকগুলো বিষয় স্থান পেয়েছে বইটির পাতায় পাতায়।
রয়েছে আল্লামা শাহ আহমদ শফী, আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী ও ড. মাওলানা খলিলুর রহমান হাফিযাহুমুল্লাহর মূল্যবান অভিমত। এছাড়াও বইটির শেষাংশে সংযুক্ত হয়েছে আমিরে হেফাজত আল্লামা আহমদ শফী হাফিযাহুল্লাহর একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় আলোচনা।
গত ১৮ এপ্রিল বৃহস্পতিবার প্রবচন প্রকাশিত এ বইটির মোড়ক উন্মোচন করেছেন দারুল উলুম হাটহাজারীর সম্মানিত মুহতামিম ও প্রধান শাইখুল হাদিস, আমিরে হেফাজত, আল্লামা শাহ আহমদ শফী হাফিযাহুল্লাহ।
[বই পরিচিতি]
নাম: সাবীলুত তাযকিয়া
ধরণ: তাসাউফ ও আত্মশুদ্ধি
প্রকাশকাল: এপ্রিল ২০১৯
পৃষ্ঠা: ১৪৪
বিক্রয় মূল্য: মাত্র ৭০ টাকা
নির্দেশক: আল্লামা আহমদ শফী হাফি.
লেখক: আহমাদ মোস্তফা
সম্পাদক: মাওলানা আনাস মাদানী
প্রুফ সম্পাদক: ইশতিয়াক সিদ্দিকী
প্রকাশক: কাজী হামদুল্লাহ
প্রচ্ছদ: মুহাম্মাদ এমদাদুল্লাহ
প্রকাশনায়: প্রবচন প্রকাশনী

যোগাযোগ: ০১৯১০২৯৬৯৫১, ০১৬৩২৬১০০৫১ (প্রবচন)
পরিবেশক: 
- বাড কম্প্রিন্ট এন্ড পাবলিকেশন্স, বাংলাবাজার, ঢাকা।
- আহমদ প্রকাশন, বাংলাবাজার, ঢাকা ও পটিয়া, চট্টগ্রাম।
- আল মানার লাইব্রেরি, আন্দরকিল্লা, চট্টগ্রাম।
- মুহাম্মাদিয়া লাইব্রেরি, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।
- বুরহানিয়া কুতুবখানা, জুম্মাপাড়া, রংপুর।
- মাকতাবাতু আহমাদ, নাটোর।

বাঙালি মুসলিম ও বাংলাদেশের কবি আল মাহমুদ
সংকলন- কাজী হামদুল্লাহ

যুগে যুগে কিছু ক্ষণজন্মা কবির আবির্ভাব ঘটে। সদ্যপ্রয়াত কবি আল মাহমুদ বিংশ শতাব্দিতে তাঁদেরই একজন। তাকে ক্ষণজন্মা বললাম এ জন্য যে, নিজের চতুর্দিকে বামপন্থীদের হিংস্র দাঁত কেলিয়ে রাখা ছিল। কিন্তু তিনি সব উপেক্ষা করে ধর্মের পথে এগিয়েছেন। পরিণতিতে দুনিয়ায় হয়তো তেমন কিছুই তিনি পাননি। তবে পেয়েছেন বিশ্বাসী প্রতিটি মানুষের মনভুবনে একখণ্ড আবাসন। শহীদমিনার আর ঢাকা শহরে সাড়ে তিনহাত জায়গা না পেলেও ওপারেও আশা করি তাঁর জন্য রয়েছে জান্নাতি গালিচা এবং বিস্তৃত শান্তিভূমি।
আসুন আমাদের প্রিয় সেই কবির জীবনবাঁকে একটু ঘুরে আসি!

#পরিচিতি
কবি আল মাহমুদ। একজন ধর্মভীরু বাংলাদেশী কবি। ১১ জুলাই ১৯৩৬  সালে বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মোড়াইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্ণ নাম মীর আব্দুস শুকুর আল মাহমুদ। তবে আল মাহমুদ হিসেবেই তিনি খ্যাতি লাভ করেন।তাঁর বাবার নাম মীর আবদুর রব ও মায়ের নাম রওশন আরা মীর। তাঁর দাদার আব্দুল ওহাব মোল্লা যিনি হবিগঞ্জ জেলায় জমিদার ছিলেন।
কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি থানার সাধনা হাইস্কুল এবং পরে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড হাইস্কুলে পড়ালেখা করেন। মূলত এই সময় থেকেই তাঁর লেখালেখির শুরু। আল মাহমুদ বেড়ে উঠেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। তিনি মধ্যযুগীয় প্রণয়োপাখ্যান, বৈষ্ণব পদাবলি, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল প্রমুখের সাহিত্য পাঠ করে ঢাকায় আসার পর কাব্য সাধনা শুরু করেন এবং একের পর এক সাফল্য লাভ করেন।
তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্প লেখক, শিশুসাহিত্যিক এবং সাংবাদিক ছিলেন। তিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি।  বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়াংশে সক্রিয় থেকে তিনি আধুনিক বাংলা কবিতাকে নতুন আঙ্গিকে, নতুন চেতনায় ও নতুন বাকভঙ্গীতে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সম্মুখ সমরেও অংশ নিয়েছেন কবি। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তীকালে প্রতিষ্ঠিত সরকার বিরোধী হিসেবে পরিচিত দৈনিক গণকণ্ঠ (১৯৭২-১৯৭৪) পত্রিকার সম্পাদকও ছিলেন।

১৯৫০-এর দশকে যে কয়েকজন লেখক বাংলা ভাষা আন্দোলন, জাতীয়তাবাদ, রাজনীতি, অর্থনৈতিক নিপীড়ন এবং পশ্চিম পাকিস্তানি সরকার বিরোধী আন্দোলন নিয়ে লিখেছেন তাদের মধ্যে মাহমুদ একজন। লোক লোকান্তর (১৯৬৩), কালের কলস (১৯৬৬), সোনালী কাবিন (১৯৭৩) ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ।

#কর্মজীবন
সংবাদপত্রে লেখালেখির সূত্র ধরে ১৯৫৪ সালে আল মাহমুদ ঢাকা আগমন করেন। সমকালীন বাংলা সাপ্তাহিক পত্র/পত্রিকার মধ্যে কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী সম্পাদিত ও নাজমুল হক প্রকাশিত সাপ্তাহিক কাফেলায় লেখালেখি শুরু করেন। পাশাপাশি দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবেও সাংবাদিকতা জগতে পদচারণা শুরু করেন। ১৯৫৫ সালে কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী কাফেলার চাকরি ছেড়ে দিলে তিনি সেখানে সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন।

১৯৭১ সালে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং অত্যন্ত বাহাদুরির সাথে মাজলুম বাঙালির জন্য লড়াই করেন।  ১৯৭২ সালে আল মাহমুদ তৎকালীন গণকন্ঠ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। যে পত্রিকাটির মালিকানা ছিল জাসদের এবং সেটি সরকারবিরোধী হিসেবে পরিচিত ছিল। আল মাহমুদের সম্পাদনায় তখন গণকন্ঠ পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেছেন গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ। তিনি মনে করেন, আল মাহমুদ গণকন্ঠের সম্পাদক থাকলেও তার দলীয় কোনো পরিচয় ছিল না। রাজনৈতিক দল জাসদের প্রতি সহানুভূতি থাকলেও আল মাহমুদ কখনো সরাসরি রাজনীতিতে জড়াননি।

১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ির সামনে জাসদের উদ্যোগে ঘেরাও কর্মসূচীর ডাক দেয়া হয়। সেদিন রাতেই তৎকালীন গণকন্ঠের সম্পাদক আল মাহমুদকে গ্রেফতার করা হয়। মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, " জাসদ গণকন্ঠের মালিক ছিল বলে আল মাহমুদ ভিকটিম হয়েছিলেন এবং তিনি অনেক দিন (প্রায় ১ বছর) বিনা বিচারে কারাগারে ছিলেন"।

 ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি গল্প লেখার দিকে মনোযোগী হন। ১৯৭৫ সালে তাঁর প্রথম ছোটগল্প গ্রন্থ পানকৌড়ির রক্ত প্রকাশিত হয়। পরে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে শিল্পকলা একাডেমীর গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের সহপরিচালক পদে নিয়োগ দেন। দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের পর তিনি পরিচালক হন। পরিচালক হিসেবে ১৯৯৩ সালে অবসর গ্রহণ করেন।

#সাহিত্যজীবন

১৯৫০ সালের পর বাংলা সাহিত্যে যত কবির আবির্ভাব হয়েছে, শিল্পমান এবং লেখার বিচারে বিশ্লেষকরা আল মাহমুদকে সন্দেহাতীতভাবে প্রথম সারিতেই রেখেছেন। ১৯৫৪ সাল অর্থাৎ ১৮ বছর বয়স থেকে তার কবিতা প্রকাশ পেতে থাকে। ঢাকা থেকে প্রকাশিত সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল পত্রিকা এবং কলকাতার নতুন সাহিত্য, চতুষ্কোণ, ময়ূখ ও কৃত্তিবাস ও বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত 'কবিতা' পত্রিকায় লেখালেখির সুবাদে ঢাকা-কলকাতার পাঠকদের কাছে তাঁর নাম সুপরিচিত হয়ে ওঠে এবং তাঁকে নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়। কাব্যগ্রন্থ লোক লোকান্তর (১৯৬৩) সর্বপ্রথম তাকে স্বনামধন্য কবিদের সারিতে জায়গা করে দেয়। এরপর কালের কলস (১৯৬৬), সোনালি কাবিন (১৯৭৩), মায়াবী পর্দা দুলে উঠো (১৯৬৯) কাব্যগ্রন্থগুলো তাঁকে প্রথম সারির কবি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৯৩ সালে বের হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস কবি ও কোলাহল।


তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার শহরমুখী প্রবণতার মধ্যেই ভাটি বাংলার জনজীবন, গ্রামীণ আবহ, নদীনির্ভর জনপদ এবং চরাঞ্চলের জীবনপ্রবাহ তাঁর কবিতায় ব্যাপকভাবে এসেছে।  আধুনিক বাংলা ভাষার প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততায় আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ তাঁর অনন্য কীর্তি। গ্রামের জীবন, বামপন্থী চিন্তা-ধারা এবং নারী মুখ্য হয়ে উঠলেও পরবর্তীতে ইসলামী ভাবধারাও প্রবল হয়ে উঠে আল মাহমুদের লেখায়।


১৯৬৮ সালে ‘লোক লোকান্তর’ ও ‘কালের কলস’ নামে দুটি কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর সবচেয়ে সাড়া জাগানো সাহিত্যকর্ম সোনালি কাবিন। ১৯৯০-এর দশক থেকে তাঁর কবিতায় বিশ্বস্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস উৎকীর্ণ হতে থাকে; এর জন্য তিনি তথাকথিত প্রগতিশীলদের সমালোচনার মুখোমুখি হন এবং এর যথোপযুক্ত জবাবও তিনি দেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আগে এবং পরে - এ সময়ের মাঝে তাঁর মতাদর্শে ব্যাপক পরিবর্তন হয়। আল মাহমুদের কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের আগে বাম ধারা দেখা গেলেও ১৯৭৪ সালের পর থেকে তাঁর কবিতায় ইসলামী ভাবধারা লক্ষ্য করা যায়। মহিউদ্দিন আহমেদের বর্ণনায় জেল থেকে মুক্তি পাবার পর 'অন্যরকম এক আল মাহমুদের' দেখা মেলে। তখন আল মাহমুদের মধ্যে ইসলামী ধ্যান-ধারণা প্রবল হয়ে উঠে বলে উল্লেখ করেন মহিউদ্দিন আহমেদ।

শুরুর দিকে বামপন্থী চিন্তাধারার হলেও, সেখান থেকে সরে এসে আল মাহমুদ কেন ইসলামী ভাবধারার দিকে ঝুঁকলেন? ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিবিসি বাংলার সাথে এক সাক্ষাৎকারে তিনি সে ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। আল মাহমুদ বলেছিলেন, তিনি কখনো মার্কসবাদী ছিলেন না বরং তাঁর চরিত্রে এক ধরনের দোদুল্যমানতা ছিল। তিনি বলেছিলেন, " আমি যে পরিবারে জন্মেছি তারা সবাই ছিল খুবই ধর্মপ্রবণ লোক। কিভাবে যেন তাদের মধ্যেই যে রয়েছে সত্যিকারের পথের ঠিকানা এটা আমাকে দূর থেকে ইশারায় ডাকতো"।

কবি হলেও আল মাহমুদ বিভিন্ন সময় সংবাদপত্রে কাজ করেছেন। কিন্তু বরাবরই তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন তাঁর কবিতাকে। মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, " আল মাহমুদ সবসময় দাবি করতেন তিনি একজন কবি। তিনি কখনোই বলেননি যে তিনি একজন সম্পাদক। আল মাহমুদ সব সময় চাইতেন তাকে তার কবিতা দিয়েই মূল্যায়ন করা হোক"।


#উল্লেখযোগ্য_প্রকাশিত_গ্রন্থ
লোক লোকান্তর (১৯৬৩), কালের কলস (১৯৬৬), সোনালী কাবিন (১৯৭৩), মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো (১৯৭৬), আরব্য রজনীর রাজহাঁস, বখতিয়ারের ঘোড়া, অদৃশ্যবাদীদের রান্নাবান্না, Al Mahmud In English, দিনযাপন, দ্বিতীয় ভাঙ্গন, একটি পাখি লেজ ঝোলা, পাখির কাছে ফুলের কাছে, আল মাহমুদের গল্প, গল্পসমগ্র, প্রেমের গল্প, যেভাবে বেড়ে উঠি, কিশোর সমগ্র, কবির আত্নবিশ্বাস, কবিতাসমগ্র, কবিতাসমগ্র-২, পানকৌড়ির রক্ত, সৌরভের, কাছে পরাজিত, গন্ধ বণিক, ময়ূরীর মুখ, না কোন শূন্যতা মানি না, নদীর ভেতরের নদী, পাখির কাছে  ফুলের কাছে, প্রেম ও ভালোবাসার কবিতা, প্রেম প্রকৃতির দ্রোহ আর প্রার্থনা কবিতা, প্রেমের কবিতা সমগ্র, উপমহাদেশ, বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ, উপন্যাস সমগ্র-১, উপন্যাস সমগ্র-২, উপন্যাস সমগ্র-৩, তোমার গন্ধে ফুল ফুটেছে (২০১৫), ছায়ায় ঢাকা মায়ার পাহাড় (রূপকথা), ত্রিশেরা ও উড়াল কাব্য।


#ব্যক্তিগত_জীবন
আল মাহমুদ ব্যক্তিগত জীবনে সৈয়দা নাদিরা বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এই দম্পতির পাঁচ ছেলে ও তিন মেয়ে রয়েছে।

#মৃত্যু
গত ২০১৯ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি ৮২ বছর বয়সে ঢাকার ধানমণ্ডির ইবনে সিনা হাসপাতা‌লে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তিনি নিউমোনিয়াসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন।

#পুরস্কার_ও_সম্মাননা
বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৮), জয় বাংলা পুরস্কার (১৯৭২), হুমায়ুন কবীর স্মৃতি পুরস্কার (১৯৭২), জীবনানন্দ স্মৃতি পুরস্কার (১৯৭২), কাজী মোতাহার হোসেন সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭৬), কবি জসীম উদ্দিন পুরস্কার, ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৬), একুশে পদক (১৯৮৬), নাসির উদ্দিন স্বর্ণপদক (১৯৯০), ভানুসিংহ সম্মাননা পদক (২০০৪), লালন পুরস্কার (২০১১)

সূত্র: উইকিপিডিয়া ও বিবিসি

ট্যাগ: #আলমাহমুদ #মুসলিমকবি #শ্রেষ্ঠকবি #সোনালিকাবিন #বাংলাকবিতাররাজপুত্র

Contact Form

Name

Email *

Message *

Powered by Blogger.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget