Articles by "স্মৃতিচারণ"


রাশিদুল ইসলাম


এক. শাইখুল ইসলামের সন্ধান

তখন নাহবেমীর জামাতে পড়ি। বয়সে অনেক ছোট। তাই দেশ-বিদেশের বিখ্যাত মাদরাসা ও যুগশ্রেষ্ঠ আলেম উলামা সম্পর্কে অবগত ছিলাম না। গ্রামের এক ছোট্ট মাদরাসায় লেখাপড়া করতাম। এতকিছু জানার উপায়ও ছিল না। উস্তাদগণ সেসব ইতিহাস শোনালেও স্মরণ রাখতে পারতাম না। কারণ আমার বয়স কম। 


ছুটির সময় আমাদের মাদরাসায় এক সাথীর সাক্ষাত হল। সে মোবাইল থেকে একটি ছবি দেখিয়ে আমাকে বলল, ছবিটি কার বলতে পারবি? 

ছবিটি দেখে বললাম, চিনি না তো! কে ইনি? সে অবাক হয়ে বলল, ইনি হলেন বাংলাদেশের সবচে’ বড় আর সর্বপ্রথম মাদরাসা; হাটহাজারী মাদরাসার মুহতামিম আল্লামা আহমদ শফী সাহেব। এ বছর আমার বড়ভাই তাঁর কাছে বুখারি শরিফ পড়ে মাওলানা হয়েছে।


তার কথাগুলো খুব মনযোগ দিয়ে শুনলাম। ভাবতে লাগলাম, ইস! আমিও যদি শাইখকে দেখতে পেতাম, আমিও তার কাছে বুখারি পড়তে পারতাম!

সাথীকে বললাম, আমিও তাঁর কাছে বুখারি শরিফ পড়বো ইনশাআল্লাহ!


দুই. শাইখুল ইসলামের সন্ধান দর্শন লাভ 

ইসলামবিরোধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-সহ ১৩ দফা দাবী নিয়ে মাঠে নেমেছে হেফাজতে ইসলাম। তখন আমি কুড়িগ্রাম জেলার অন্যতম মাদরাসা হামিচ্ছুন্নাহতে কাফিয়া পড়ি। একদিন আমাদের দরসে একজন উস্তাদ বললেন, দেশের দুই সিংহপুরুষ শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর হাতে হাত রেখে হেফাজতের ব্যানারে দেশের শীর্ষ উলামায়ে কেরাম ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। ৬ এপ্রিল ঐতিহাসি ঢাকা লংমার্চ করা হয়েছে। লংমার্চ পরবর্তী সমাবেশে দেশের প্রতিটি বিভাগেও সমাবেশ কর্মসূচির ঘোষণা এসেছে। সেই অনুযায়ী উত্তরবঙ্গে বগুড়ার কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে ফকিহুল মিল্লাত আল্লামা মুফতী আব্দুর রহমান রহ. এর সভাপতিত্বে ২৯ এপ্রিল ২০১৩ শানে রেসালাত মহাসম্মেলনের তারিখ দেয়া হয়। এতে আমিরে হেফাজত শাইখুল ইসলাম আল্লামা আহমদ শফী ও মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীসহ দেশের বড় বড় উলামায়ে কেরাম যোগ দেবেন।


সংবাদটি শুনে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত হই। কুড়িগ্রাম থেকে শানে রেসালাত সম্মেলনে যোগ দিতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিই। সবার প্রস্তুতির চেয়ে আমার প্রস্তুতিটা ছিল একটু ভিন্ন। কারণ এটাই ছিল আমার জীবনে সর্বপ্রথম কোন আন্দোলনে যোগদান। দ্বিতীয়ত প্রাণপ্রিয় শাইখদের একনজর দেখার জন্য বহুদিনের অপেক্ষা। শাইখুল ইসলামের মত আধ্যাত্মিক রাহবার; যাকে না দেখেও প্রতিদিন তাঁর প্রতি মুগ্ধতা আর ভালবাসা বেড়েই চলেছে। 


শতবাধা উপেক্ষা করে একপর্যায় আমরা মাঠে পৌঁছলাম। আল্লাহু আকবার! শাইখুল ইসলামের আহ্বানে শানে রেসালাত সম্মেলনে লক্ষাধিক ধর্মপ্রাণ তাওহিদী জনতার ঢল নেমেছে। পুরো ময়দান কানায় কানায় পূর্ণ। আমরা কয়েকজন স্টেজের সামনে গিয়ে বসলাম। এখনো মাঠে পৌঁছেননি আমিরে হেফাজত, মহাসচিব ও ফকিহুল মিল্লাত। অপেক্ষার প্রহর গুণতে গুণতে একসময় সংবাদ এল, তাঁরা মাঠের দিকে রওনা দিয়েছেন। তাঁদের আগমন সংবাদে নারায়ে তাকবির স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠল পুরো ময়দান। তিন শায়খকে স্টেজে তোলা হল। এ সম্মেলন উপলক্ষ্যে তিন জীবন্ত আকাবিরকে জীবনে সর্বপ্রথম দেখার সৌভাগ্য হল আলহামদুলিল্লাহ।


 তিন. প্রথম বাইআত এবং তাসবিহ কথন

যেদিন শুনেছি আল্লামা শাহ আহমদ শফী হাফি. তাসাউফের প্রসিদ্ধ চার তরিকার পীর ও মুরশিদ সেদিন থেকেই তাঁর কাছে ‘বাইআত আলাত তাওবা’ করে আমলের মাধ্যমে জীবন পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। হৃদয়ে সর্বোচ্চ সম্মানের স্থানে জায়গা দিয়েছি তাঁেক। 


কবে তাঁর সোহবত পাবো এইই ছিল ভাবনা। একদিন শুনতে পেলাম, শাইখুল ইসলাম রংপুর হাজীপাড়া মাদরাসায় মেশকাতের সমাপনী দরস দিতে আসবেন। এদিকে শাইখুল ইসলামের আগমনে আমাদের মাদরাসা থেকে দু’টি বাস রিজার্ভ করা হয়েছে। ছাত্রদেরও যাওয়ার সুযোগ আছে। আমি শুনে অত্যন্ত খুশি হলাম। ভাবলাম আজ মাহেন্দ্রক্ষণ। আজ শাইখের হাতে বাইআত হতে পারবো। 

হাজীপাড়ায় পৌঁছার কিছুক্ষণ পর শাইখ এলেন। অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে মুসাফাহা করা সম্ভব হয়নি। সংক্ষিপ্ত সময়ে আলেম-উলামা এবং ছাত্রদের উদ্দেশ্যে তিনি সময়োপযোগী মূল্যবান নসিহত করলেন। এরপর সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। সেদিন আর  কোন কিছুর সুযোগ হল না।


একসময় উস্তাদগণের পরামর্শে ঢাকার যাত্রাবাড়ী মাদরাসায় হিদায়া জামাতে ভর্তি হলাম। আমাদের কিছু সাথী উম্মুল মাদারিস হাটহাজারীতে ভর্তি হল। তাদের সাথে যোগাযোগ রেখে শাইখের খোঁজ-খবর রাখতাম। একদিন সাথীরা ফোনে জানালো, এবার হাটহাজারী মাদরাসার বার্ষিক মাহফিলে সফরে আসতে পারো। মাহফিলের দিন শাইখের হাতে বাইআত হওয়ার সুযোগ মিলতে পারে। 

দারুণ উৎসাহিত হলাম। ট্রেনের দীর্ঘ সফর শেষে হাটহাজারী এলাম। মাদরাসার গেটের সামনে আসতেই মনটা জুড়িয়ে গেল। আশ্চর্যের বিষয় হল, গেট দিয়ে প্রবেশ করা মাত্রই দেখতে পেলাম, এহাতা ভবনের দ্বিতীয় তলায় আমাদের প্রাণপ্রিয় শাইখ বসে আছেন। লাইনে দাঁড়িয়ে মানুষ মুসাফাহা করছে। আমরা আনন্দে দৌঁড়ে গিয়ে মুসাফাহার জন্য লাইনে দাঁড়ালাম। সালাম দিয়ে দু’হাত বাড়িয়ে মুসাফাহা করলাম।

এরপর আমার শাইখে সানি আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর দেখা পেলাম। দুঃখজনক কথা হল, সে সফরেও শাইখের কাছে বাইআত হওয়ার সুযোগ হল না।


বছরের শেষে একবার শুনতে পেলাম শাইখ ঢাকা ফরিদাবাদ মাদরাসায় বুখারি শরিফের আখেরি দরস দেবেন এবং বাইআত করাবেন। হয়তো এবার আল্লাহ তাআলা দিলের আশাটুকু পূরণ করবেন। মাগরিব নামায শেষে হাজার হাজার আলেম উলামা এবং ছাত্রদের নিয়ে শাইখ বুখারি শরিফের আখেরি দরস দিলেন। সবশেষে এলান করা হল, ফজরের পরে বাইআত করানো হবে। বাদ ফজর বাইআতের উদ্দেশ্যে শাইখ রুমাল বাড়িয়ে দিলে তাঁর হাতের সাথে হাত লাগিয়ে রুমাল ধরার সুযোগ হয়। বাইআত শেষে তিনটি আমলের সবক দিয়ে তিনি বলেন, ‘বাদবাকি আমল কখনো হাটহাজারী গেলে আমার সাথে দেখা করে নিবেন অথবা মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস সাহেবকে আমি বলে রাখবো তাঁর কাছে নিয়ে নিবেন’। আমি শাইখের সামনে বসা ছিলাম, শাইখ আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,ও মিয়া, তোমার তাসবিহ আছে ? হালকা মাথা নাড়িয়ে ক্ষীণ আওয়াজে বললাম, নেই। শাইখ বলেন, ‘এখান থেকে যাওয়ার পর একশত দানার তাসবিহ খরিদ করবেন, সকাল-সন্ধা ছয়শত বার আল্লাহর যিকির করবেন’। আমি বললাম, জী ইনশাআল্লাহ। শেষ বারের মত শাইখের সাথে মুসাফাহা করে যাত্রাবাড়ীর দিকে রওনা হলাম এবং পৌঁছেই শাইখের কথামত জীবনের প্রথম তাসবিহ ক্রয় করলাম। 


বছর শেষ হলে আসাতেযায়ে কেরামের পরামর্শে হাটহাজারীতে ভর্তি হই এবং শাইখের নিসবতে খানকায়ে মাদানীতে যথাসাধ্য সময় দেয়ার চেষ্ট করি। ২০১৮ সালে শাইখের কাছে রাসুল সা. এর ঐশী বাণী হাদিসের সর্বোচ্চ কিতাব বুখারি শরিফ ও শামায়েল তিরমিযি এবং মসনবী শরিফ দরসান পড়ার সৌভাগ্য হয়। এছাড়াও বেশকিছু কিতাবের ইজাযত পেয়ে তাঁর নগন্য শাগরিদ হওয়ার সৌভাগ্য হয়, যেটা আমার বহুদিনের সাধনা এবং জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া।


শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী নিছক একটি নাম নয় একটি পরিবর্তনের ইতিহাস। তাঁর মেহনতের বদৌলতে হাজারো মানুষের অন্তরে আল্লাহর ধ্যান ও মুরাকাবার দৌলত অর্জিত হয়, যারা রাতের শেষাংশে জাগ্রত হয়ে আল্লাহ কুদরতি পায়ে সিজদায় লুটে পড়ে, যিকিরে মাশগুল হয়। তাঁর সাহসিকতায় আজ আলেম উলামা একতাবদ্ধভাবে দীনের কাজ আঞ্জাম দেয়ার হিম্মত পায়। 


লেখক, ফাজেলে দারুল উলুম হাটহাজারী


মহান আল্লাহ তায়ালার এই বিশ্বজাহানে অনেক ধর্ম ও বর্ণের লোক বসবাস করছে। প্রত্যেকের রয়েছে স্বতন্ত্র তাহযিব-তামাদ্দুন, কৃষ্টি-কালচার। রয়েছে নিজ নিজ ধর্মীয় ও গোষ্ঠীগত আচার-অনুষ্ঠান। এভাবেই পৃথিবীর বয়স বাড়ছে।

আমার জীবনের প্রায় আড়াই যুগ ধরে যে দেশের ঈদ উদযাপন করে এসেছি তা ছিল আমার প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে। গত বছর যদিও আরব ভূখণ্ডে ঈদ দেখার তাওফিক হয়েছিল কিন্তু ঈদ পালন করা হয় বাংলাদেশে ফিরে। জীবনের এই প্রথম ঈদ যা কিনা পালিত হলো সূর্যোদয়ের দেশে। একটি অমুসলিম প্রধান দেশে। 

আমার জীবনের সুন্দর ও ভিন্নধর্মী একটি অভিজ্ঞতা হলো জাপানের ঈদে। জাপানে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশি ও পাকিস্তানিদের নিয়ে ঈদের নামাজ আদায় করলাম। জাপানে ঈদ উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোন ছুটি বরাদ্দ নেই। তবে এবারের ঈদ সাপ্তাহিক ছুটির দিন রবিবার হওয়ায় মুসলিম কমিউনিটির প্রত্যেকে খুব খুশি ছিল। কারণ রবিবার ছাড়া অন্য কোনোদিন ঈদ হলে হয়তো অনেকেই ঈদের জামাতেও অংশ নিতে হতে পারত না। সবমিলিয়ে রবিবার ঈদ হওয়াটা আমাদের জন্য ডাবল ঈদের আমেজ নিয়ে এসেছে। 

অনেকের সঙ্গে অন্যান্য দিনের ঈদগুলোর অভিজ্ঞতা শেয়ার করে জানতে পেরেছি, সপ্তাহের অন্যান্য দিনের ঈদ মানে কোনরকমে শুধু নামাজ পড়া। এছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। পরিবারকে সময় দেওয়া যায় না। ঘোরাঘুরির ফুরসতও মিলে না। 

আর এই বছর করোনাভাইরাসের কারণে বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট করে ঈদ জামাতের আয়োজন করা হয়। এখানের সব মসজিদ সরকারি
রেজিস্ট্রারভুক্ত নয়। আর রেজিস্ট্রারকৃত মসজিদগুলোতে পুলিশ এসে ওয়ার্নিং দিয়ে গেছে যাতে বড় জমায়েত না হয়। তাই মুসাফা কোলাকোলি ছাড়াই ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজকেরা তাদের সাধ্যের মধ্যে কিছু মিষ্টান্নভোজের ব্যবস্থা করেছিলেন। ফলে প্রবাসজীবনে একাকি থাকা রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের কিছুটা হলেও ঈদের মিষ্টিমুখ হয়েছে। তবে আজ রবিবার না হয়ে যদি অন্যদিন হতো তবে আমার অভিজ্ঞতা হয়তো অন্যভাবেই ব্যক্ত করা যেত।


তাওহীদ আদনান কাসেমী: তিনি আঁধারে জ্বালতেন আলো। শিখাতেন জীবন-সমাচার। দু:খ-দুর্দশা ও কষ্ট-ক্লেশের মাঝেও দিতেন পথের দিশা। সে পথের পথিক হয়ে কত-শত পথিক সফল হয়েছে, কত অনুর্বর ভূমি ফসল দিয়েছে, কত হৃদয় আলোকিত হয়েছে, কত জীবন বিকশিত হয়েছে, তার ইলমের শাখা-প্রশাখা ও তাদরীসী খেদমতের প্রবাহিত বাতাসে কত সমুদ্রে জোয়ার বয়েছে, তার উজ্জ্বল প্রদীপ শিখায় কত আঁধার দূরিভূত হয়েছে, তার কল্পনা করাও দায়। আকাশ থেকে যখন বৃষ্টি ঝরে, তার ফোঁটা কী আর গণনা করা যায়? আর আলোকরশ্মির পরিমাপ করতে যাওয়া তো বোকামী বৈ কিছু নয়।
বলছি আমার প্রিয় উস্তাদে মুহতারাম মুফতী সাঈদ আহমাদ পালনপুরী রহ.-এর কথা। গতকালও বাদ ফজর হুজুরকে দামাত বারাকাতুহু বলেছি। আজ বাদ ফজর বলতে হচ্ছে ‘রাহিমাহুল্লাহ’। গতকালকের সকাল আর আজকের সকাল, মাত্র একদিনের ব্যবধান। গতকাল ২৫ রমজান ১৪৪১ হিজরী মোতাবেক ১৯ মে ২০২০ মঙ্গলবার বাদ ফজরও তাকে নিয়ে লিখেছি। তখন তিনি ছিলেন। আজও বাদ ফজর তাকে নিয়ে লিখছি, অথচ আজ তিনি নেই।

পালনপুরী রহ.-কে নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। তাঁর পরিচিতি ছিলো বিশ্বময়। তাঁর নামের সাথে পরিচিত হয়েছিলাম ইবতেদায়ী জামাত পড়াকালেই। দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি হওয়ার পর তাঁর মর্যাদা ও গুরুত্ব অনুধাবনে আসে পূর্ণাঙ্গ রূপে। তখন থেকেই হৃদয়ের গহীনে জায়গা দিয়েছি তাঁকে; গহীন থেকেও গহীনে। দেওবন্দের প্রথমদিন থেকেই তাঁর প্রতি মুগ্ধতা পেয়ে বসে আমায়। মাঝারি গড়ন। সুঠাম দেহ। স্বচ্ছ অবয়ব। শুভ্র ললাট। চেহারায় ঈমানের দ্যূতি। মধ্যম দাড়ি। মাথায় সাদা আরবী রুমাল। গায়ে আরবি জুব্বা। কথা-বার্তায় দৃঢ়তা। কাজে-কর্মে ধীরস্থিরতা। চলা-ফেরায় মাধুর্যতা। উন্নত রুচিশীলতা। স্বভাব-চরিত্রে গাম্ভীর্যতা, যেখানে রুক্ষতার লেশ মাত্র নেই।

দরসের মসনদে সবসময় দেখা যেতো তাঁর আলোর ঝলক। আলোচিত বিষয়ের আলোকে হাস্য-রসের মাধ্যমে মাতিয়ে রাখতেন তিনি সকলকে যাদুময়তার সাথে। দেওবন্দে গিয়ে ভর্তি হয়েছিলাম মেশকাতে। মেশকাতে তাঁর কোনো দরস না থাকলেও তাঁর চুম্বকীয় আকর্ষণ মাঝে মাঝেই আমাকে টেনে নিয়ে যেতো তাঁর দরসে হাদিসের মসনদ পানে। পরের বছর দাওরা হাদিসে ভর্তি হওয়ার পর নিয়ম মাফিক তাঁর ছাত্রত্ব গ্রহণের সৌভাগ্য অর্জন হয়। দরসের মসনদে তাঁর অনন্যতা, ইলমের প্রশস্ততা ও মুহাদ্দিসী শান সূর্যের ন্যায় আলোর বিচ্ছুরণ ঘটাতো প্রতিনিয়তই। পাঠদানের ক্ষেত্রে ছিলো তাঁর অনন্য দক্ষতা। হাদিস হোক আর ফিকাহ হোক, রিজাল শাস্ত্র হোক আর ইলমে কালাম হোক, যে কোনো বিষয়ের আলোচনা এলে সমানতালেই তিনি আলোচনা করে যেতেন অনায়সে। আলোচনার স্বচ্ছতা ছিলো আয়নার মতো। যে বিষয়ে আলোচনা করতেন তার সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্ম বিষয়েও জ্ঞান অর্জন করে ফেলতো শ্রবণকারীরা৷

তাঁর চতুর্মুখী এই অসীম যোগ্যতার কারণে ছাত্র অবস্থাতেই দেওবন্দের ইন্তেজামিয়া কমিটি তাঁকে মুঈনে মুদাররিস হিসেবে বাছাই করে নেন৷ আর ফারাগাতের কয়েক বছর পরই মজলিসে শুরা তাকে উস্তাদ হিসেবে নিয়োগ দিয়ে গুজরাত থেকে ডেকে আনে৷ তিনি একজন গুণবান মুহাদ্দিস ছিলেন৷ এ কারণেই তো তাঁর দরসের সময়ে কোনো ছাত্রের সামান্য দেরি হলেই আর জায়গা পাওয়া সম্ভব হতো না দরসগাহে৷ শুধু হিন্দুস্তান নয় বরং পুরো বিশ্বের আনাচে-কানাচেও ছড়িয়ে আছে তাঁর ছাত্র ও শিষ্যগণ৷

তিনি শুধু একজন শিক্ষকই ছিলেন না বরং হাদিসের মসনদে একজন অভিজ্ঞ মুহাদ্দিস, ফিকহের মাসআলায় একজন বিজ্ঞ ফকিহ আর লেখালেখির ময়দানে ছিলেন একজন সাহসী কলম সৈনিক৷ ছিলেন হাদিসের একজন কিংবদন্তি ব্যাখ্যাকার, যুগশ্রেষ্ঠ মুহাক্কিক। তিনি ছিলেন ইলমে কালামের ময়দানে লড়াকু সৈনিক৷ ছিলেন দেওবন্দিয়াতের এক উজ্জ্বল নমুনা। দেওবন্দিয়াতের ফিকরী ও নযরিয়্যাতী মধ্যমপন্থার ধারকবাহক৷ এর ফলেই তাঁকে বলা হতো তরজুমানে দারুল উলুম দেওবন্দ৷ হাদিসের শরাহের পাশাপাশি সমসাময়িক বিবিধ বিষয়ে তিনি অসামান্য সাক্ষর রেখেছেন স্বীয় ক্ষুরধার লিখনির মাধ্যমে৷ তাঁর প্রতিটি বিষয়ের কিতাবই গ্রহণযোগ্যতার চরম শিখরে পৌঁছে যেতো লেখার সাথে সাথেই৷

তাঁর লিখিত অনন্য গ্রন্থাবলীর মধ্যে অন্যতম হলো তাফসিরের কিতাব হেদায়াতুল কুরআন, আলফাউযুল কাবীরের তাশরীহ ও তা’লীক, মাবাদিউল উসুল, মাবাদিউল ফালসাফা, মিফতাহুত তাহযীব, মাহফুযাত, হায়াতে ইমাম দাউদ, মাশাহিরে মুহাদ্দিসীন, হায়াতে ইমাম ত্বহাবী, ইসলাম তাগাইয়ুর পযীর দুনিয়া মে, কেয়া মুকতাদী পর ফাতিহা ওয়াজিব হ্যায়? নবুওয় নে ইনসানিয়াত কো কেয়া দিয়া? হুরমতে মুসাহার, তাহযীবুল মুগনী, তুহফাতুল আলমায়ী শরহে তিরমিযী ৮ খ-ে, তুহফাতুল কারী শরহে বুখারী ১২ খ-ে। রহমাতুল্লাহিল ওয়াসিআহ শরহে হুজ্জাতিল্লাহিল বালিগাহ ৭ খ-ে ইত্যাদি৷ এগুলো ছাড়াও আরো বহু কিতাব তিনি লিখেছেন বিভিন্ন বিষয়ে৷ রহমাতুল্লাহিল ওয়াসিআ তো হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগার এমন একটি শরাহ যার অপেক্ষায় ছিল মানুষ প্রায় তিনশো বছর যাবৎ৷

হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ.-এর কিতাব হুজ্জাতিল বালিগা প্রায় তিনশো বছর ধরে এমন একজন কলম সৈনিকের দিকে চেয়ে ছিলো চাতক পাখির ন্যায় যেখানে কুরআন ও হাদিসের ইলমের পাশাপাশি ইসলামি ফালসাফা ও আহকামে শরঈয়্যাহ এরও আলোচনা থাকবে সমানভাবে৷ তিনি উক্ত শরাহটি এমনভাবেই লিখেছেন যে, শাহ সাহেবের সমস্ত মুরাদ এবং সকল কঠিন ও দুর্বোধ্য ইবারত সহজ হয়ে গিয়েছে পানির মতো৷ এই শরাহ লেখার আগে তো কিতাবের মুরাদ উদঘাটনের জন্য সকলকে শারিরীক শ্রমের পাশাপাশির কঠিন যেহনী শ্রম ব্যয় করতে হতো৷ তদুপুরি এর মানজিলে মাকসাদে যাওয়া ছিল দূরহ ব্যাপার৷ এই শরাহ সে সকল দুর্বোধ্যতা ও কষ্ট দূর করে দিয়েছে এখন৷ আল্লাহর রহমতে সেই কিতাবের একসেট সংগ্রহও করে নিয়ে নেওয়া হয়েছে অধমের৷ বাস্তবেই এই শরাহটা মুফতি সাহেব রহ.-এর একটি কালজয়ী রচনা৷ এটি তাঁর এমন একটি শরাহ বা রচনা যে, ইলমের গভীরতাকে যদি এই একটি কিতাবের মাঝেও সীমাবদ্ধ ধরে নেওয়া হয় তদুপুরি তার ইলমের উজ্জ্বল আলোকমালা ইলমী ময়দানে চিরদিন জ্বলজ্বল করতে থাকবে অনবরত৷

হযরত মুফতী সাহেব রহ. ১৩৬০ হিজরী মোতাবেক ১৯৪০ ঈসায়ী সনে পিতৃভূমি গুজরাতের কালিরায় পালনপুর নামক এলাকায় জন্ম গ্রহণ করেন৷ পরিবারে যদিও ইলমের বিবেচনায় বিশেষ কেউ ছিলেন না কিন্তু দ্বীনদার ছিলেন৷ দ্বীনদারী পরিবেশের কারণে ছোট থেকেই মাদরাসার আঙ্গিনায় আসা-যাওয়া শুরু হয় তাঁর৷ জন্মভূমি পালনপুরেই প্রাথমিক পড়ালেখা ও মকতব ইত্যাদি শেষ করেন৷ এরপর আরবি ও ফারসি পড়ার জন্য দারুল উলুম গুজরাত গমন করেন৷ সেখানে মামা মাওলানা আবদুর রহমান কিতাব বিভাগের উস্তাদ ছিলেন৷ তাঁর কাছেই ফারসি পড়েন৷ এরপর পালনপুরের এক মাদরাসায় শরহে জামী পর্যন্ত পড়েন৷ সেখান থেকে পড়ালেখা শেষ করে এসে মাযাহেরে উলুম সাহারানপুরে ভর্তি হন এবং টানা তিন বছর পড়েন এখানে৷

১৩৮০ হিজরীতে দারুল উলুম দেওবন্দে এসে ভর্তি হন এবং দারুল দেওবন্দের ইলমের ঝর্ণায় গোসল করেন৷ বিশেষভাবে তিনি যাঁদেও কাছ থেকে ইলমী দক্ষতা অর্জন করেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন, মাওলানা সাইয়্যেদ হাসান দেওবন্দী, মাওলানা আবদুল জলীল কিরানভী, মাওলানা আসলামুল হক আজমী, মাওলানা ক্বারী তৈয়্যব সাহেব দেওবন্দী, মাওলানা ফখরুদ্দীন মুরাদাবাদী, আল্লামা ইবরাহীম বালিয়াভী, শায়েখ মাহমুদ আবদুল ওয়াহহাব মিসরী এবং মুফতী মাহদী হাসান শাহজাহানপুরী অন্যতম৷ 

১৩৮২ সালে নম্বরে আউয়াল হয়ে ফারাগাত হাসিল করেন৷ অন্তরে ইলমের জযবা ছিল অধিক পরিমাণে৷ রব্বে কারীম যোগ্যতাও দিয়েছিলেন৷ তাই তাকাযা ছিলো ইলমের সাগরে আরো কিছুদিন ডুবে থাকবেন৷ অবস্থাদৃষ্টে দেওবন্দেই ইফতার দরখাস্ত দিয়ে দেন এবং মঞ্জুরিও এসে যায়৷ ফলে ইফতায় ভর্তিও হয়ে যান তখনই৷ আর তখনই ইন্তেজামিয়া কমিটি তাকে মুঈনে মুদাররিস হিসেবে নির্বাচন করে বসেন৷

শিক্ষাজীবন শেষ হলে আল্লামা ইবরাহীম বালিয়াভী রহ. দারুল উলুম আশরাফিয়া গুজরাতে খেদমতে দিয়ে দেন৷ ১৩৮৪ থেকে ১৩৯৩ পর্যন্ত সেখানে ইলমী আলোকরশ্মির বিচ্ছুরণ ঘটান৷ এরপর দেওবন্দের ইন্তেজামিয়া কমিটি তাঁকে উস্তাদ হিসেবে নিয়োগ দিয়ে সেখান থেকে ডেকে আনেন৷ তিনি নিজের সৌভাগ্য ভেবে ডাকে সাড়া দেন এবং শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত এখানেই নিয়োজিত থাকেন দরস ও তাদরিসের খেদমতে৷ এখানে বসেই তিনি ইলমী ও ফিকরী গবেষণার দুর্ভেদ্য কাজ আঞ্জাম দেন৷ এখানেই তিনি কুরআন ও হাদিসের তাশরীহাতে নিযুক্ত থাকেন; তাফসীর ও হাদিসের দরস ও তাদরীসে মশগুল থাকেন৷ শিক্ষকতার জীবনে তিনি এমন মণি-মুক্তার চমক ঘটিয়েছেন যে, বিশাল একটা জগত তাঁর প্রতি মোহিত হয়ে গেছে, এক বিশাল দুনিয়া তাঁর প্রেমাসক্তিতে প্রেমিক বনে গেছে৷ তার তাদরীসী, তাশরীহী, তাকরীরী, তাসনীফী, ইসলাহী ও তারবিয়াতী খেদমতের মূল্যায়ণ এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে সম্ভব নয়৷

ভাগ্য নির্ধারক তাঁর ভাগ্যে মৃত্যুর ফায়সালা তখনই করে রেখেছিলেন, যখন দুনিয়াবাসী তাকে নতুন করে অস্তিত্বে আনয়নের ইচ্ছায় হাবুডুবু খাচ্ছিল, যখন তাঁকে দুনিয়াবাসীর আরো বেশি প্রয়োজন ছিল।

আসলে পৃথিবীর সবকিছু তার চিরাচরিত নিয়মেই চলমান৷ পাহাড় থেকে ঝর্ণা বয়ে যাচ্ছে৷ ঝর্ণা আবার সমুদ্রের সাথে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে৷ আকাশ থেকে বৃষ্টি নামছে৷ জমিন থেকে উদ্ভিত উঠছে৷ চাঁদ-সূর্য তার আলো বিলিয়ে যাচ্ছে৷ দুনিয়ার সব কিছুই নিয়ম মাফিক চলছে৷ প্রতিটি সূচনারই একটি অন্ত রয়েছে৷ ফলে ছোট থেকে বেড়ে উঠতে উঠতে সব কিছুই আবার বিলীন হয়ে যাচ্ছে৷ পৃথিবীর এই চিরাচরিত নিয়মের আওতায়ই মুফতি সাহেব রহ.-এর ছায়াও আজ বিলীন হয়ে গেলো আমাদের থেকে৷ তাঁর সুশীতল ছায়া সরে গেলো আমাদের মাথার উপর থেকে৷ আমরা হয়ে গেলাম আশ্রয়হীন; ছায়াহীন৷ এখন শুধু সান্ত¡নার বাণীস্বরূপ বলতে হয়, তিনি যাওয়ার জন্যই এসেছিলেন৷ ফলে তিনি চলে গেছেন৷ সান্ত¡নার বাণীস্বরূপ বলতে হয়, তিনি চলে গেছেন তবে আমাদের মাঝে রেখে গেছেন তাঁর ইলমী খেদমত ৷

মুফতি সাহেব হুজুর রহ. যদিও দুনিয়া থেকে চলে গিয়েছেন কিন্তু তাঁর ইলমী খেদমতের কারণে তিনি আমাদের মাঝে জীবন্ত হয়ে থাকবেন চিরদিন৷ মৃত্যু যদিও সকলকে দুনিয়ার বুক থেকে অচেনা বানিয়ে দেয় কিন্তু মুফতী সাহেব রহ.-এর মতো মানুষেরা ইলমী খেদমতের কারণে মরেও বেঁচে থাকেন দুনিয়াবাসীর অন্তরে৷ এমন মানুষর জন্য মৃত্যুই আসল জীবনের দরজা, অভীষ্ট লক্ষ্যে সোপান। সে জীবনের জন্য তারা মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকেন যুগের পর যুগ, সে জীবনের জন্য মানুষের অন্তরে ভালোবাসার প্রদীপ শিখা প্রজ্জ্বলিত হয় এবং আলোর পিদিম আরো আলোকিত হয়৷

মুফতী সাহেব রহ. ছিলেন একটি ফুটন্ত ফুল। দুনিয়াবাসী আজ তার সুঘ্রাণ থেকে বঞ্চিত৷ তিনি ছিলেন ইলমী অভিভাবক৷ ইলমী বিবেচনায় দুনিয়াবাসী আজ ইয়াতীম৷ ইলমের খাজানা ছিলেন তিনি৷ ইলমে নবুওয়াত অর্জনকারীরা এক মহান ব্যক্তিত্ব হারালো৷ ফিকর ও তাহকীকের সূর্য ছিলেন, যা চিরতরে অস্তমিত হয়ে গেলো৷ গতকালও বাদ ফজর হুজুরের খবর নিলাম৷ দোয়া করলাম৷ শুনলাম স্বাস্থ্য অনেক বেশি খারাপ৷ ফুসফুসে পানি এসে গিয়েছিলো৷ শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে৷ মনটা খারাপ হয়েছিল৷ কিন্তু আশাহত ছিলাম না৷ দোয়া-মোনাজাত করে ঘুমুতে গেলাম৷ ঘুম থেকে জেগেই খবর পেলাম তিনি ঘুমিয়ে গেছেন চিরতরে৷ আল্লাহ পাক হুজুরকে জান্নাতবাসী করুন, আমিন৷

লেখক:
আলেম ও সাংবাদিক
ফাজেল, দারুল উলুম দেওবন্দ


আরিফ জব্বার 
১. তোমাদের জীবন যেদিকেই যাক, দ্বীনী খেদমতের সাথে সবসময় নিজেকে সম্পৃক্ত রাখবে৷ এ মেরি ওসিয়্যাত হ্যাঁয়৷

২. দিল মে জিহাদ কি তামান্না রাখখো,,

৩. কোনো উস্তাদের ইন্তেকালের সংবাদ শুনলে তাঁর জানাযায় হাজির হবার কৌশিশ করবে৷ যদি সম্ভব না হয় অন্তত তিনবার সুরায়ে ইখলাস পড়ে তাঁর জন্য দোআ করবে৷ 

তাই আমরা যারা হযরতের ছাত্র আছি এবং হযরতের সকল মুহিব্বীনদের নিকট আরজি আমরা সকলেই মুহতারামের নসিহাতের উপর আমল করি, অন্তত তিনবার সুরায়ে ইখলাস পড়ে হযরতের জন্য দোআ করি৷ আল্লাহ তাআলা যেন মুহতারাম উস্তাদকে জান্নাতের সম্মানীত মেহমান হিসেবে কবুল করেন৷ আমিন!


৫ মে গভীর রাতে তাহাজ্জুদের সময় নামাযরত, জিকিররত নবীপ্রেমিক তৌহিদি জনতার উপর ইতিহাসের নিকৃষ্টতম বর্বরতা চালিয়েছিল আওয়ামী প্রশাসন। গুলির মুহুর্মুহু আওয়াজে প্রকম্পিত হয়ে উঠেছিল শাপলা চত্বরের আকাশ-বাতাস।

ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও গভীর রাত পর্যন্ত নেতাকর্মীদের সাথেই স্টেজে ছিলেন মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী হাফিযাহুল্লাহু। নেতাকর্মীদের বিপদের মুখে ফেলে তিনি কোথাও যেতে রাজি হননি। চতুর্দিক থেকে যখন বুলেটের বুক কাঁপানো আওয়াজ আসছিলো তখনো
আল্লামা বাবুনগরী স্টেজেই। আগ থেকেই ওজু করে পবিত্র অবস্থায় ছিলেন। মৃত্যু হলে শাপলা চত্বরেই হবে, প্রয়োজনে শাহাদাত বরণ করবেন কিন্তু নেতাকর্মীদের রেখে তিনি নিজে কোথাও যাবেন না। 

আহ! উম্মহর কী দরদি একজন নেতা। হ্যাঁ, প্রকৃত নেতা এমনি হওয়া চাই, যিনি নিজের নিরাপত্তার চেয়ে কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে ভাববেন।

অবস্থা মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ আকার ধারণ করলো । বুলেটের আঘাতে শাপলার জমিনে লুটিয়ে পড়ছিল নবীপ্রেমিকের দেহ। প্রায় কোটি মানুষের বিশাল জমায়েত , চাইলেই কী মুহূর্তের মধ্যে স্থান ত্যাগ করা যায়? জল কামান, বুলেট ও লাঠিচার্জে দিগ্বিদিক ছুটতে হয়েছে নবীপ্রেমিকদের। 

পরিস্থিতির ভয়াবহতা দেখে কিছু নেতাকর্মী আল্লামা বাবুনগরীকে স্টেজ থেকে নামিয়ে একটি মসজিদে নিয়ে গেলেন। যাওয়ার পথে হোঁচট খেয়ে রাস্তায় পড়ে গেলেন আল্লামা বাবুনগরী। এক সাক্ষাৎকারে আল্লামা বাবুনগরীকে বলতে শুনেছি- হোঁচট খেয়ে রাস্তায় পড়ে যাওয়ার পর দৌঁড়াদৌঁড়ির মধ্যে প্রায় দেড়শ থেকে দুইশ মানুষ আল্লামা বাবুনগরীর গায়ের উপর দিয়ে অতিক্রম করেছিল। তখন আল্লামা বাবুনগরীর দম বন্ধ হয়ে আসছিলো। প্রাণ বের হয়ে যাবার উপক্রম। তিনি কালেমা পড়ছিলেন। আল্লাহ তাআলার অশেষ রহমতে তিনি বেঁচে ছিলেন সেদিন।

সামান্য পথ অতিক্রম করার পর বিদ্যুতের বিশাল এক তার ছিঁড়ে আল্লামা বাবুনগরীর গায়ে পড়লো। হায়! মসিবতের পর মসিবত! পুরো শরীর কারেন্ট হয়ে গেলো। যেই আল্লামা বাবুনগরীকে ধরছিল তাকেই কারেন্ট শক করছিল। এই মহাবিপদেও আল্লাহ তাআলা গায়েবী নুসরত করেছেন, বাঁচিয়েছেন তাঁকে।

আল্লামা বাবুনগরীর উভয় হাঁটুতে তখন বেশ জখম। গায়ের কাপড় ছেঁড়া, চোখে ছিল না চশমাও। দেড় থেকে দুইশ মানুষ কারো গায়ের উপর দিয়ে অতিক্রম করলে সেই মানুষটার অবস্থা কী হয় তা সহজেই অনুমেয়।

যাক, কোনমত আল্লামা বাবুনগরীকে একটি মসজিদে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখান থেকে নেয়া হলো হসপিটালে। তখন বাইরের পরিস্থিতি খুবই নাযুক। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে আল্লামা বাবুনগরীকে অ্যাম্বুলেন্সে লালবাগ মাদরাসায় নিয়ে গেলেন কর্মীরা। দেশবাসীর সামনে সে রাতের বাস্তবচিত্র তুলে ধরে সাংবাদিক সম্মেলন করতে চাইলেন আল্লামা বাবুনগরী। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে অনুমতি দেয়া হলো না।

৬ মে সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম আসার উদ্দেশ্যে লালবাগ মাদরাসা থেকে বের হলেন আল্লামা বাবুনগরী। প্রায় ২০০ গজ অতিক্রম করার পর ঢাকেশ্বরী মন্দির এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হলো আল্লামা বাবুনগরীকে। ডিবি পুলিশ আল্লামা বাবুনগরীকে তাঁর বহন করা গাড়ি থেকে নামিয়ে তাদের (ডিবির)
গাড়িতে উঠিয়ে নিলো। 

বয়োবৃদ্ধ এ মুহাদ্দিসকে রিমান্ডের পর রিমান্ড দেয়া হলো। হেফাজত আন্দোলনে কেবলমাত্র বিশ্বনবী সা. এর ইজ্জত রক্ষায় আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই ত্যাগ তিতিক্ষা করেছেন তিনি। তাই আজও জেলজীবন, রিমান্ড ইত্যাদি বিষয়ে মুখ খুলে তেমন কিছুই বলেন না আল্লামা বাবুনগরী। 

একদিন কথা প্রসঙ্গে জেলজীবনের স্মৃতিচারণ করে বড় আফসোসের সাথে আল্লামা বাবুনগরীকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছিলেন- গ্রেফতার হওয়ার পর আমার শারীরিক অবস্থা বিশেষ করে পায়ের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিলো। দাঁড়াতে খুবই কষ্ট হতো। দাঁড়িয়ে নামায পড়তে পারতাম না। তাই জেলখানায় একদিন বসে নামায পড়ার জন্য আমি একটি চেয়ার চেয়েছিলাম।কিন্তু সেদিন নামাযের জন্য একটি চেয়ারও দেয়া হয়নি। বলা হয়েছিল- আপনি আসামি, আসামির জন্য আবার চেয়ার কীসের! আহ!

স্রেফ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এসব ত্যাগ স্বীকার করেছেন তাই হয়ত আল্লামা বাবুনগরী জেল জীবনের দুঃখ কষ্ট বলেন না। বললে জানতে পারতাম যে, জালিমের বন্দিশালায় আল্লামা বাবুনগরী কতই না জুলুম সহ্য করেছেন। না জানি কত অমানবিক নির্যাতনের স্বীকার হয়েছেন জগদ্বিখ্যাত এ মুহাদ্দিস। 

হেফাজত আন্দোলনের সকল ত্যাগ-তিতিক্ষা আল্লাহ তাআলা কবুল করুন এবং সুস্থতার সাথে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী হাফিযাহুল্লাহুকে দীর্ঘ নেক হায়াত দান করুন, আমিন।

লেখক: শিক্ষার্থী, দারুল উলুম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।

Contact Form

Name

Email *

Message *

Powered by Blogger.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget